টাঙ্গুয়ার হাওর-এর সফরে দ্বিতীয় দিনের সকালটা সাধারণত এই নদীর জন্যই রাখা হয়। জাদুকাটা — মেঘালয়ের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের অসংখ্য ছড়া মিলে জন্ম নেওয়া এক আন্তঃসীমান্ত নদী, যার পানি এত স্বচ্ছ যে শীতে তলার বালু-পাথরের বিন্যাস পর্যন্ত চোখে পড়ে। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে বারেক টিলা (স্থানীয় উচ্চারণে বারিক্কা/বারিক টিলা) — ওপরে উঠলেই এক ফ্রেমে নদী, পাহাড় আর মেঘ।
নদীটা চেনা যাক
- উৎপত্তি ও পথ: ভারতের মেঘালয়ের খাসি হিলসের ছড়াগুলোর মিলনে তৈরি তেজি স্রোতধারা বাংলাদেশে নেমে তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পেরিয়ে বয়ে গেছে ~৩৭ কিমি; ফাজিলপুরের দিকে এর নাম হয় ‘রক্তি’, শেষে বৌলাই নদীতে মিলন (জেলা প্রশাসন/সারাখন)। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় নদীটির নম্বর ৭২; ঐতিহাসিক গড় প্রস্থ ছিল মাত্র ~৫৭ মিটার।
- আদি নাম ও কিংবদন্তি: নদীর আগের নাম ছিল রেণুকা। ‘জাদুকাটা’ নামের পেছনে করুণ এক জনশ্রুতি (ভ্রমণগাইড): পাড়ের গাঁয়ের এক বধূ শিশুপুত্র ‘যাদু’কে কোলে নিয়ে মাছ কাটছিলেন; অন্যমনস্কতায় মাছের বদলে কেটে ফেলেন নিজের সন্তানকেই — সেই মর্মান্তিক কাহিনি থেকে নাম ‘যাদু-কাটা’। গ্রামবাংলার নদীনামে এমন লোককথা বিরল নয়; সত্য-মিথ্যা যাই হোক, নামটা নদীর গায়ে আটকে গেছে শতাব্দী ধরে।
- রূপের ঋতুচক্র: বর্ষায় প্রবল স্রোত আর পাহাড়ি পানির উচ্ছ্বাস; শুষ্ক মৌসুমে দীর্ঘ সাদা বালুচর, নুড়ি পাথর আর কাচের মতো পানি। সকালে পাহাড়ের ছায়া জলে, বিকেলে সোনালি আলো — ডেইলি কান্ট্রি টুডের ভাষায় জায়গাটা ‘মেঘ, পাহাড় আর নদীর মিলনবিন্দু’।
বারেক টিলা: ৩৬৫ একরের সবুজ মুকুট
- পরিচিতি: লাউড়ের গড় এলাকায়, সীমান্ত ঘেঁষে প্রায় ১৫০ ফুট উঁচু (ভ্রমণগাইড) সবুজ টিলা; মোট এলাকা ~৩৬৫ একর নানা প্রজাতির গাছে ঢাকা (বাংলা উইকিপিডিয়া)। টিলার বুক চিরে টেকেরঘাটগামী পিচঢালা রাস্তা — বাইক-রাইডারদের কাছে এখন জনপ্রিয় রুট; পায়ে হেঁটে ওঠাও চলে।
- নতুন ভিউ পয়েন্ট: সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের উদ্যোগে এখানে সম্প্রতি (২০২৫) একটি ভিউ পয়েন্ট গড়া হয়েছে — টাঙ্গুয়া-নীলাদ্রি-শিমুল রুটের অফিসিয়াল অংশ এখন এই টিলা (ডেইলি কান্ট্রি টুডে)।
- গ্রাম ও মানুষ: টিলায় কড়ইগড়া ও রাজাই গ্রাম; প্রায় ৪০টি আদিবাসী পরিবার — মূলত গারো ও খাসিয়া, যাঁদের অনেকে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী; মাঝখানে গির্জা আছে, বড়দিনে টিলা ঘুমায় না — প্রতিটি বসতির এক বাড়ি হয় ‘ক্রিসমাস হাউস’, রাতভর গান-নাচ-রান্না (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)। টিলার ওপারের ভারতীয় পাহাড়ে একটি তীর্থস্থান ও একটি মাজার আছে — নির্দিষ্ট দিনে পূণ্যস্নান/উরসের জন্য সীমান্ত ১–২ দিন খুলে দেওয়া হয় বলে উইকিপিডিয়া জানায়।
- কী করবেন: ওপরের বিশাল সবুজ মাঠে খালি পায়ে হাঁটা (অভিজ্ঞদের ভাষ্য — ‘বিদেশের পাহাড়ি মাঠের’ অনুভূতি), ঘোড়ায় চড়ে টিলা ঘোরা (৫০–১০০ টাকা), পাশের দুটি মিষ্টি পানির ছড়া (বর্ষা ছাড়া প্রায় শুকনো), ভোরে কুয়াশা ভেদ করে সূর্যোদয়; ক্যাম্পিংয়ের জন্যও জায়গাটি পরিচিত হচ্ছে।
সত্যকথা: বালুখেকোদের কবলে নদী
জাদুকাটার গল্পটা আজ শুধু সৌন্দর্যের নয়। বিডিনিউজের মতামত-বিশ্লেষণ (সেপ্টেম্বর ২০২৬) অনুযায়ী, কয়েক দশকের নিয়ন্ত্রণহীন বালু-পাথর উত্তোলন, ড্রেজিং আর পাড় কেটে বালু তোলায় নদীর প্রস্থ কোথাও কোথাও ৫৭ মিটার থেকে বেড়ে ৩ কিলোমিটার পর্যন্ত ফুলে গেছে — এটি প্রাকৃতিক বিস্তার নয়, পাড় খুবলে নেওয়ার ফল। বারিক্কা টিলা, লাউড়ের গড়, ঘাগটিয়া, মানিগাঁওসহ অন্তত ২০টি গ্রাম ভাঙনের ঝুঁকিতে; হুমকির মুখে বিশ্বখ্যাত শিমুল বাগানও (বিডিনিউজ)। রাতে ড্রেজার-বোমা মেশিনে বালু তোলার অভিযোগও ধারাবাহিক। পর্যটক হিসেবে করণীয়: উত্তোলন-কর্মকাণ্ডের ধারেকাছে যাবেন না, নদী থেকে বালু-পাথর ‘স্যুভেনির’ হিসেবে তুলবেন না, আর এই তথ্যগুলো জানা থাকলে ভ্রমণটা শুধু ছবিতে সীমাবদ্ধ থাকে না।
যাওয়া, থাকা, খাওয়া
- রুট: ঢাকা → সুনামগঞ্জ বাসে (নন-এসি ~৮০০–৯০০, ৬–৭ ঘণ্টা); সুনামগঞ্জ শহর থেকে লাউড়ের গড় হয়ে বাইকে (~২০০–২৫০ টাকা, ~১ ঘণ্টা ২০ মিনিট) বা সিএনজিতে এসে ছোট নৌকায় জাদুকাটা পেরোলেই বারেক টিলা (ভ্রমণগাইড/ডেইলি কান্ট্রি টুডে)।
- হাওর-সফরের সঙ্গে: টাঙ্গুয়ার হাউসবোট প্যাকেজে দ্বিতীয় দিন জাদুকাটা-বারেক টিলা সাধারণত যুক্ত থাকে — নৌকায় গেলে অতিরিক্ত ভাড়া লাগতে পারে (~২,০০০–৪,০০০ টাকা), টেকেরঘাট থেকে বাইকেই অনেকে সুবিধা পান (কুহুডাক)। বোট ঠিক করার সময়ই জাদুকাটা যাওয়া হবে কি না পরিষ্কার করে নিন।
- থাকা-খাওয়া: বড়ছড়া বাজারে সাধারণ গেস্ট হাউস (২০০–৪০০ টাকা) ও তাহিরপুরে হোটেল আছে; টিলায় ও টেকেরঘাটে সাধারণ মানের দেশি খাবারের হোটেল মেলে — ভালো খাবারের জন্য সুনামগঞ্জ শহরই ভরসা।
একদিনের নমুনা সূচি (টাঙ্গুয়ার সঙ্গে)
- ভোর: হাউসবোটে সূর্যোদয়; টেকেরঘাটে নেমে বাইকে লাকমাছড়া হয়ে বারেক টিলা।
- সকাল: ভিউ পয়েন্ট থেকে নদী-পাহাড়ের প্যানোরামা; গ্রামে হাঁটা, ঘোড়ার রাইড।
- দুপুর: টিলার হোটেলে/টেকেরঘাটে খেয়ে নীলাদ্রি লেক (পরের পোস্টের গন্তব্য) — সন্ধ্যায় তাহিরপুর/সুনামগঞ্জ ফেরা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বারেক টিলায় উঠতে কষ্ট হয়?
না — পিচঢালা রাস্তা ধরে বাইকেই ওঠা যায়; হেঁটে উঠলে ১৫–২০ মিনিটের সহজ চড়াই।
জাদুকাটায় সাঁতার কাটা যায়?
স্রোত ও উত্তোলনের গভীর গর্তের ঝুঁকি আছে — স্থানীয়দের নির্দেশ ছাড়া নামবেন না; শীতে অগভীর স্বচ্ছ অংশেই পা ভেজানো পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকুন।
কখন গেলে সেরা দৃশ্য?
বর্ষার শেষ থেকে শরৎ — পাহাড় সবুজ আর নদীতে পানি ভরা; শীতে পানি সবচেয়ে স্বচ্ছ, তবে চর বেশি।
শেষকথা
জাদুকাটা আর বারেক টিলা মিলে তাহিরপুরের সবচেয়ে ‘ছবিময়’ জুটি — কিন্তু নদীটা বাঁচলে তবেই ছবিটা থাকবে। হাওর-সফরের মূল ভিত্তি টাঙ্গুয়ার হাওর গাইডে দেওয়া; পরের পোস্টে টেকেরঘাটের নীলাদ্রি লেক।