• 31 Oct, 2026

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেউড়িয়ায় ফকির লালন শাহের আখড়াবাড়ি ও মাজার — যেখানে ১৮৯০ সালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মাজার ভবন (১৯৬৩), লালন একাডেমি (২০০৪), দোল পূর্ণিমা ও তিরোধান দিবসের লালন মেলা (১৩৬তম উৎসব হলো ১৭–১৯ অক্টোবর ২০২৬) এবং যাওয়ার পূর্ণ গাইড।

কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ছেউড়িয়া — কালীগঙ্গা নদীর তীরে এই ছোট্ট গ্রামটিই বাংলার সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক ঠিকানাগুলোর একটি। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ এখানেই গড়েছিলেন তাঁর আখড়াবাড়ি, এখানেই শিষ্যদের দিতেন সাধনার শিক্ষা, আর এখানেই ১৮৯০ সালে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দেড় শ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই মাটিতে একতারার সুর থামেনি — সারা বছর শান্ত মাজার-প্রাঙ্গণ, আর বছরে দুইবার লাখো মানুষের মিলনমেলা। যাঁরা লালনের গান শুনেছেন, তাঁদের জন্য ছেউড়িয়া শুধু ভ্রমণ নয়, এক ধরনের ঋণশোধ।

সাঁইজি ও তাঁর আখড়া: যা জানা দরকার

লালন শাহের জন্মসাল নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে এখনো বিতর্ক আছে — সাধারণভাবে আনুমানিক ১৭৭৪ সাল ধরা হয়; জন্মস্থান নিয়েও একাধিক দাবি প্রচলিত। তবে তাঁর জীবনের কেন্দ্র যে ছেউড়িয়ার আখড়া, তাতে সন্দেহ নেই। জীবদ্দশায় তিনি প্রতি শীতকালে আখড়ায় মহোৎসবের আয়োজন করতেন — সহস্রাধিক শিষ্য জড়ো হতেন, দিনরাত চলত সংগীত আর সাধুসঙ্গের আলোচনা (ভ্রমণগাইড)। তাঁর দর্শনের মূল কথা ছিল মানুষ — জাত-ধর্মের ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে মানুষের পরিচয়ই মুখ্য; দেহতত্ত্ব, আত্মঅন্বেষণ, প্রেম ও সাম্যের বাণী তাঁর গানে গানে ছড়িয়ে আছে, যা থেকে জন্ম নিয়েছে একটি পুরো সংগীত-ঐতিহ্য। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক (১৮৯০) তিনি ছেউড়িয়াতেই দেহত্যাগ করেন এবং এখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়; মাজারের পাশে সারি ধরে রয়েছে তাঁর প্রধান শিষ্যদের (যেমন পিয়ারী বেগম, শীতল শাহ) কবর — গোটা প্রাঙ্গণটাই তাই একটি জীবন্ত সাধক-বংশতালিকা।

যা দেখবেন: মাজার ভবন, লালন একাডেমি ও আখড়াবাড়ি

বর্তমান সাদা রঙের আধুনিক মাজার ভবনটি নির্মিত হয় ১৯৬৩ সালে; পরে ২০০৪ সালে অডিটোরিয়ামসহ গড়ে ওঠে লালন একাডেমি কমপ্লেক্স (কুষ্টিয়া-বিষয়ক প্রতিবেদন)। কমপ্লেক্সে আছে লালন মুক্তমঞ্চ — উৎসবের সময় যেখানে আলোচনা সভা ও গভীর রাত পর্যন্ত লালনগানের আসর বসে। সাধারণ দিনে প্রাঙ্গণ শান্ত: মাজারে শ্রদ্ধা জানিয়ে, শিষ্যদের কবরগুলো দেখে, আখড়াবাড়ির পুরনো অংশ ঘুরে আর কালীগঙ্গার তীরে কিছুক্ষণ বসে কাটানো যায় এক-দেড় ঘণ্টা। স্থানীয় বাউল-শিল্পীরা প্রায়ই প্রাঙ্গণে গান গেয়ে শোনান — শুনতে বসলে লালনের কথাগুলো বইয়ের পাতা থেকে নেমে এসে জীবন্ত হয়ে ওঠে। ছবি তোলা যায়, তবে মাজারের ভেতরে ও সাধুদের সাধনার সময় মর্যাদা বজায় রাখা আবশ্যক; নারী-পুরুষ সবার জন্য শালীন পোশাকই প্রত্যাশিত।

বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি: বাউল গান

ছেউড়িয়ার মাটি থেকে উঠে আসা এই সুরধারার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও এসেছে: ইউনেস্কো ২০০৫ সালে বাউল গানকে মানবতার মৌখিক ও অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০০৮ সালে তা আনুষ্ঠানিকভাবে অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্বমূলক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় (ইউনেস্কো)। গবেষকেরা মনে করেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই বাউল গানের ভাবাদর্শ বিশ্ববাসীর নজরে আনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন — বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের সুরও এসেছে বাউল গগন হরকরার একটি গান থেকে (সাহাপেডিয়া)। তাই ছেউড়িয়া সফর মানে শুধু একটি মাজার দেখা নয় — বিশ্ব-ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত এক জীবন্ত সংগীত-ঐতিহ্যের উৎসস্থলে দাঁড়ানো।

লালন মেলা: বছরে দুইবার মহামিলন (সবশেষ উৎসব ১৭–১৯ অক্টোবর ২০২৬)

ছেউড়িয়ায় লালন মেলা বসে বছরে দুইবার: ফাল্গুনে দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে (সাধারণত মার্চ, ৩ দিন) এবং কার্তিকে সাঁইজির তিরোধান দিবসে (১ কার্তিক, মধ্য-অক্টোবর, ৩ দিন)। এই খবর লেখার ঠিক আগে, ১৭–১৯ অক্টোবর ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ১৩৬তম তিরোধান দিবসের স্মরণোৎসব ও মেলা — লালন একাডেমি, জেলা প্রশাসন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে; উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী, আর লাখো ভক্ত-দর্শনার্থীর ভিড়ে প্রাঙ্গণ ছিল মুখরিত (দৈনিক কুষ্টিয়া)। উৎসবের প্রাণ সাধুদের নিজস্ব আচার — প্রথম সন্ধ্যায় বাল্য সেবার মধ্য দিয়ে মূল সাধনা-পর্ব শুরু হয়, পরের দিনগুলোতে সকালে রাখাল সেবা ও দুপুরে পুণ্য সেবা (সময়ের প্রত্যাশার উৎসব-প্রতিবেদন); এর বাইরে গুরুকার্য ও অধিবাসসহ প্রচলিত আচারসমূহ পালিত হয়। পাশাপাশি মুক্তমঞ্চে আলোচনা ও রাতভর বাউলগান, আর বাইরে গ্রামীণ মেলা। প্রশাসন মেলাকে মাদকমুক্ত ও নিরাপদ রাখতে বিশেষ অভিযানও চালায় (জেলা পুলিশ, অক্টোবর ২০২৬)। মেলায় গেলে ভিড় ও থাকার সংকট মাথায় রেখে আগেভাগে কুষ্টিয়া শহরে হোটেল ঠিক করুন; শান্ত দর্শন চাইলে উৎসবের বাইরের সাধারণ দিন বেছে নেওয়াই ভালো।

কীভাবে যাবেন

কুষ্টিয়া শহর থেকে ছেউড়িয়া কয়েক কিলোমিটার পূর্বে, কুমারখালীর পথে — বাস, সিএনজি বা ইজিবাইকে সহজে যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে কুষ্টিয়ায় সরাসরি বাস চলে, ট্রেনেও (পোড়াদহ স্টেশন হয়ে) আসা যায়। দক্ষিণবঙ্গের এই ভ্রমণ-বৃত্তে আগের গন্তব্য হিসেবে ঝিনাইদহ শহরের ঐতিহ্য ও বারোবাজার মিলিয়ে নেওয়া যায়; কুষ্টিয়ার ভেতরে লালনের সঙ্গে একই সফরে শিলাইদহের রবীন্দ্র-কুঠিবাড়ি জুটি বাঁধাটাই সবচেয়ে চলতি পরিকল্পনা — দুটোই কুমারখালী উপজেলায়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

লালন শাহের মাজার কোথায়?

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেউড়িয়া গ্রামে, কালীগঙ্গা নদীর তীরে — তাঁর আখড়াবাড়ির প্রাঙ্গণে। তিনি ১৮৯০ সালের ১ কার্তিক এখানেই দেহত্যাগ করেন।

লালন মেলা কখন হয়?

বছরে দুইবার, প্রতিবার ৩ দিন: দোল পূর্ণিমায় (মার্চের দিকে) ও তিরোধান দিবসে ১ কার্তিক (মধ্য-অক্টোবর)। ১৩৬তম তিরোধান উৎসব হয়েছে ১৭–১৯ অক্টোবর ২০২৬।

সাধারণ দিনে গেলে কী দেখা যাবে?

মাজার ভবন (১৯৬৩), লালন একাডেমি কমপ্লেক্স ও মুক্তমঞ্চ, প্রধান শিষ্যদের কবর, আখড়াবাড়ি — সঙ্গে কালীগঙ্গার তীরের শান্ত পরিবেশ; প্রায়ই স্থানীয় বাউলদের গানও শোনা যায়।

মেলার সময় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা কী?

মেলা উপলক্ষে এলাকায় অস্থায়ী ব্যবস্থা থাকলেও লাখো মানুষের ভিড়ে সংকট দেখা দেয় — কুষ্টিয়া শহরে আগেভাগে হোটেল বুক করাই নিরাপদ।

মাজারে যাওয়ার শিষ্টাচার কী?

শালীন পোশাক, মাজারের ভেতরে নীরবতা ও মর্যাদা, সাধুদের সাধনা-আচারে বিঘ্ন না ঘটানো — এগুলো মেনে চলুন; ছবি তোলার আগে প্রয়োজনে অনুমতি নিন।

শেষকথা

ছেউড়িয়ার মূল্য এর স্থাপত্যে নয়, এর বাতাসে — যেখানে দেড় শ বছর ধরে মানুষ প্রশ্ন করে চলেছে, মানুষ আসলে কে। মেলার ভিড়ে হোক বা নির্জন দুপুরে, লালন আখড়া বাংলার সবচেয়ে গভীর প্রশ্নগুলোর সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার জায়গা। একতারার সুরে ভেসে আসা সেই প্রশ্ন শুনে ফেরাটাই এই ভ্রমণের আসল প্রাপ্তি।