• 29 Oct, 2026

লাউড়ের গড় ও হলহলিয়ার রাজবাড়ি: হারানো লাউড় রাজ্যের সন্ধানে

লাউড়ের গড় ও হলহলিয়ার রাজবাড়ি: হারানো লাউড় রাজ্যের সন্ধানে

প্রাচীন লাউড় রাজ্য — শ্রীহট্টের তিন রাজ্যের একটি, নবগ্রামে রাজধানী, বিজয় মাণিক্যের সিক্কা মুদ্রা; ২০১৯ সালে ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ ঘোষিত লাউড় দুর্গ, হলহলিয়ার হাওলি রাজবাড়ি ও ১০০+ বছরের শাহ আরেফিনের মেলা; যাচাইকৃত ঐতিহ্য-গাইড।

বারেক টিলায় ওঠার পথে যে গ্রামটায় খেয়া পেরিয়ে নামতে হয়, তার নাম লাউড়ের গড়। নামের ভেতরেই ইতিহাস লুকিয়ে — ‘গড়’ মানে দুর্গ। প্রায় হাজার বছর ধরে এই হাওর-সীমান্তের মাটির নিচে ঘুমিয়ে আছে বাংলার অন্যতম প্রাচীন রাজ্যের রাজধানীর দুর্গ: লাউড় রাজ্য।

লাউড় রাজ্য: শ্রীহট্টের তিন রাজ্যের একটি

  • তিন রাজ্যের সিলেট: প্রাচীন শ্রীহট্ট (সিলেট) বিভক্ত ছিল গৌড়, লাউড় ও জয়ন্তীয়া — এই তিন রাজ্যে (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)। লাউড়ের বিস্তার ছিল আজকের সুনামগঞ্জ জেলা ও হবিগঞ্জ ও ময়মনসিংহের অংশজুড়ে; হলহলিয়া-কেন্দ্রিক বর্ণনায় চতুসীমা ছিল পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্র নদ, পূর্বে জৈন্তা, উত্তরে কামরূপ সীমান্ত, দক্ষিণে ব্রহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
  • কিংবদন্তির স্তর: জনশ্রুতি অনুযায়ী লাউড় পরগণায় ছিল মহাভারতখ্যাত কামরূপ-রাজা ভগদত্তের উপরাজধানী, এবং তাঁর বংশের ১৯ জন নৃপতি এ অঞ্চলে রাজত্ব করেছিলেন বলে পুরাকীর্তি-ভিত্তিক ধারণা আছে — এটি ইতিহাসের চেয়ে বেশি ঐতিহ্য-কথা, সেই অনুযায়ীই পড়ুন (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
  • ইতিহাসের স্তর: নিধনপুর তাম্রলিপির সূত্রে কামরূপের রাজারা সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত এ অঞ্চল শাসন করেন; ~৭৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে লাউড় কামরূপ থেকে আলাদা হয়ে যায়, দশম শতক থেকে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে শাসন চলে (জেলা-ইতিহাস সংকলন)। প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নাম আসে কেশব মিশ্র সিংহের — কৌনজ গোত্রীয়, খ্রিস্টীয় দশম-একাদশ শতকে তিনি লাউড় গড়ে তোলেন (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)।
  • বিজয় মাণিক্য: রাজ্যের সবচেয়ে খ্যাতিমান শাসক (একাদশ–দ্বাদশ শতাব্দী, সাল নিয়ে মতভেদ আছে)। তাঁর সময়ে রাজ্য বিস্তৃত হয়, বল্লাল সেনের নির্যাতনে বঙ্গের ব্রাহ্মণেরা তাঁর রাজ্যে আশ্রয় নেন বলে ইতিহাস-সংকলনে উল্লেখ আছে। তিনি জগন্নাথপুর রাজ্য প্রতিষ্ঠা (১১৯১) করেন এবং নিজের ও দুই স্ত্রীর নামে সিক্কা মুদ্রা ছাড়েন — সেই মুদ্রা আজ ঢাকার জাদুঘরে সংরক্ষিত (বাংলা উইকিপিডিয়া)। পরবর্তীতে (চতুর্দশ শতকে, দিব্য সিংহের সময়) রাজধানী স্থানান্তর হয় নবগ্রামে — আজ যা তাহিরপুরের বাদাঘাট ইউনিয়ন এলাকা। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তালিকায় রাজ্যটির কালসীমা ধরা হয়েছে আনুমানিক ৬০০–১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ — শেষে জয়ন্তীয়া ও মোগল শাসনের মধ্যে বিলীন।
  • নামের টিকে যাওয়া: লাউড় পরে জমিদারি-আমলের একটি পরগণা হিসেবেই বেঁচে ছিল — হাসন রাজার বিশাল জমিদারির পরগণা-তালিকায় ‘লাউড়’ নামটি এখনো পাওয়া যায় (বাসস)।

যা দেখবেন আজ

  • লাউড়ের গড় (লাউড় দুর্গ): জাদুকাটা নদীর তীরে, সীমান্তবর্তী গ্রাম। ২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এখানে প্রাথমিক খনন শুরু করে ও নানা প্রত্ননিদর্শন পায়; ২০১৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় দুর্গটিকে ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ ঘোষণা করে (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড/ইউএনবি)। খনন ও গবেষণা চালিয়ে এখানে উন্মুক্ত জাদুঘর গড়ার পরিকল্পনার কথা তখন জানানো হয়েছিল; সুনামগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আশপাশের খাস জমিতে পর্যটন-অবকাঠামো গড়ার আশাও ব্যক্ত করেছিলেন। মাঠে আজ দুর্গের চেহারা সুস্পষ্ট নয় — এটি ‘কল্পনায় রাজধানী দেখার’ জায়গা; প্রতিটি প্রকোষ্ঠের কারুকার্য দেখে বোঝা যায় এখানে কোনো সম্ভ্রান্ত রাজা থাকতেন (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)।
  • হলহলিয়ার হাওলি রাজবাড়ি: দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের হলহলিয়া গ্রাম — স্থানীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী লাউড়ের রাজধানীর রাজপ্রাসাদ, রাজা বিজয় সিংহ কর্তৃক ৯ম শতাব্দীতে নির্মিত (বাংলা উইকিপিডিয়া; নির্মাতা-কাল নিয়ে এই অঞ্চলের ইতিহাসে একাধিক পরম্পরা আছে)। ৩০ একর জুড়ে ছিল বন্দীশালা, সিংহদ্বার, নাচঘর, দরবার হল, পুকুর ও সীমানা-প্রাচীর — অংশবিশেষ আজও দৃশ্যমান। দুর্গ-ধ্বংসাবশেষ স্থানীয়ভাবে ‘লাউড়ের হাউলী/হাবেলী’ নামেও পরিচিত (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)।
  • শাহ আরিফিনের মোকাম ও মেলা: লাউড়ের গড়ের কাছেই শাহ আরিফিনের মাজার/মোকাম; তাঁর আস্তানার স্মৃতিচিহ্ন (সাতটি কূয়া, সুড়ঙ্গপথ, পাথরে নামাজের পদচিহ্ন) সীমান্তের ওপারে খাসিয়া পাহাড়ে রয়েছে বলে স্থানীয় বর্ণনা (আদার ব্যাপারী)। ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো শাহ আরেফিনের মেলা বসে প্রতি বছর তিন দিন — পাশের রাজারগাঁওয়ের পণতীর্থ ধামে বারুণী স্নানের (দোলপূর্ণিমার ১৩ দিন পর) দিন থেকেই শুরু (আদার ব্যাপারী; বাংলাপিডিয়ার তাহিরপুর-প্রবেশেও দুটি মেলাই উল্লেখযোগ্য)। মেলায় একসময় সীমান্ত খুলে দেওয়া হতো দুই দেশের মানুষের মিলনে — গণ্ডগোলের পর তা আর হয় না (আদার ব্যাপারী)। পণতীর্থের পাশে রাজারগাঁওয়ে সম্প্রতি গড়ে উঠেছে অদ্বৈত আচার্য মন্দিরও।

প্রত্যাশা ব্যবস্থাপনা ও যাওয়া

এটি ঝাঁ-চকচকে পর্যটন-স্পট নয় — অবকাঠামো সীমিত, নির্দেশিকা-ফলক প্রায় নেই। যাঁরা প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস ভালোবাসেন, তাঁদের জন্যই এই যাত্রা। যাওয়ার রুট বারেক টিলার মতোই: সুনামগঞ্জ থেকে বাইক/সিএনজিতে লাউড়ের গড় (খেয়াঘাট সংলগ্ন); হলহলিয়া রাজবাড়ির জন্য তাহিরপুর থেকে স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে পথ নিন — দুর্গম হাওরপথে স্থানীয় গাইড ছাড়া রাজবাড়ি খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে পারে। মেলার সময় (চৈত্রের দিকে) গেলে দুই মেলার জমজমাট রূপ দেখা মিলবে, ভিড়ও তেমনই। সংরক্ষিত পুরাকীর্তি এলাকায় কোনো কিছু সরানো/ক্ষতি করা আইনত দণ্ডনীয় — ছবি তুলুন, ছাপ রেখে যাবেন না।

নমুনা সূচি (বারেক টিলা সার্কিটের সঙ্গে)

  • সকাল: খেয়া পেরিয়ে লাউড়ের গড় গ্রাম ও মোকাম; দুর্গ-এলাকা ঘুরে দেখা।
  • দুপুর: স্থানীয় হোটেলে খেয়ে হলহলিয়া রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ।
  • বিকেল: বারেক টিলা — জাদুকাটা ও সূর্যাস্ত।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

লাউড়ের গড়ে কি দুর্গের দেয়াল দেখা যায়?

বড় আকারের স্থাপনা দাঁড়িয়ে নেই — খননে পাওয়া নিদর্শন ও ভগ্নাবশেষই ভরসা; ইতিহাস জানা থাকলে জায়গাটা জীবন্ত হয়ে ওঠে।

খনন কি এখনো চলছে?

ঘোষণা-পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ খননের হালনাগাদ তথ্য সীমিত; সর্বশেষ যাচাই করা খবরে (২০১৯) আরও খনন ও উন্মুক্ত জাদুঘরের পরিকল্পনা ছিল।

শাহ আরেফিনের মেলা কবে হয়?

বারুণী স্নানের দিন থেকে তিন দিন — সাধারণত চৈত্র মাসে (দোলপূর্ণিমার ১৩ দিন পর); যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে তারিখ নিশ্চিত করুন।

শেষকথা

লাউড়ের গল্প প্রমাণ করে হাওরের জলরাশির নিচে শুধু মাছ নয়, হাজার বছরের সাম্রাজ্যও ঘুমিয়ে থাকে। সার্কিটের বাকি দুই ঠিকানা — জাদুকাটা-বারেক টিলা ও টাঙ্গুয়ার — আগের পোস্টগুলোতে; পরের পোস্টে সুনামগঞ্জের শিল্পনগরী ছাতকে।