• 29 Oct, 2026

লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ভ্রমণ গাইড: উল্লুকের বন, খাসিয়া পুঞ্জি ও বনের বুক চিরে রেললাইন

লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ভ্রমণ গাইড: উল্লুকের বন, খাসিয়া পুঞ্জি ও বনের বুক চিরে রেললাইন

কমলগঞ্জের লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যান (ঘোষণা ৭ জুলাই ১৯৯৬, ১,২৫০ হেক্টর, পশ্চিম ভানুগাছ রিজার্ভ ফরেস্ট) — বাংলাদেশের একমাত্র বানরজাতীয় প্রাইমেট উল্লুকের প্রধান আবাস, ৭ প্রজাতির বানরগোষ্ঠী, ~২৪৬–২৪৯ প্রজাতির পাখি, দুটি খাসিয়া পুঞ্জি, মাগুরছড়া গ্যাস-বিস্ফোরণের (১৯৯৭) ক্ষত ও ট্রেইল-ভ্রমণের যাচাইকৃত গাইড।

শ্রীমঙ্গল শহর থেকে মাত্র ~৮ কিলোমিটার গেলেই চা বাগানের সবুজ শেষ হয়ে শুরু হয় আরেক ধরনের সবুজ — উঁচু গাছের চাঁদোয়ায় ঢাকা, আলো প্রায় পৌঁছায় না এমন আদিম আঁধারের লাওয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। দেশের সবচেয়ে বেশি গবেষণা ও দর্শন পাওয়া বনগুলোর এটি একটি, আর বাংলাদেশের সবচেয়ে বিপন্ন এক প্রাণীর শেষ ভরসা।

পরিচিতি: ছোট্ট বনে অসাধারণ ঘনত্ব

  • অবস্থান ও মর্যাদা: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায়, ২,৭৪০ হেক্টর পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের ভেতরে ১,২৫০ হেক্টর এলাকা নিয়ে এই উদ্যান; ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী আইনে ১৯৯৬ সালের ৭ জুলাই জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয় (বাংলাদেশ প্রতিদিন/পর্যটন বোর্ড)। আইইউসিএন শ্রেণি ২।
  • বনের চরিত্র: আধা-চিরহরিৎ ও মিশ্র বন — তবে এর ইতিহাস পুরোপুরি ‘আদিম’ নয়: ১৯২০-এর দশকে এলাকাটির অংশ কাঠ-উৎপাদন বাগান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, পরে প্রকৃতি ধীরে ধীরে নিজের দখল ফিরিয়ে নিয়েছে (ভ্রমণ-বিবরণ)। ছোট ছোট টিলা, ঝিরি আর প্রায় বারোমাসি জলধারা বনের ভেতরের ভূগোল।
  • সহ-ব্যবস্থাপনার পাঠশালা: বাংলাদেশে সংরক্ষিত এলাকার সহ-ব্যবস্থাপনা (স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে পরিচালনা) মডেলের অন্যতম প্রথম পরীক্ষাগার এই লাওয়াছড়া (ন্যাশনাল-পার্কস ডট অর্গ)।

তারকা বাসিন্দা: উল্লুক

  • বাংলাদেশের একমাত্র এপ (মানবসদৃশ বানর): পশ্চিমা হুলক গিবন বা উল্লুক — লম্বা হাতে ডাল থেকে ডালে দোল খেয়ে চলে, ভোরে পরিবার মিলে সুরেলা ডাক দেয়, যার শব্দ বনের বহুদূর পর্যন্ত যায় (ট্রিপঅ্যাডভাইজর/ন্যাশনাল-পার্কস)। মহাবিপন্ন এই প্রাণীর বাংলাদেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভবত শেষ টেকসই জনগোষ্ঠীর বাস এখানেই; ১৯৯৭ সালের এক জরিপে উদ্যানে অন্তত ৪৯টি উল্লুকের কথা এসেছিল (ডেইলি স্টারে প্রকাশিত তৎকালীন প্রধান বন সংরক্ষকের চিঠি)।
  • আরও ছয় প্রাইমেট: দেশের ১০ প্রজাতির বানরগোষ্ঠীর ৭টিই এই বনে — চশমা হনুমান (ফেয়ারের পাতা-বানর), মুখপোড়া হনুমান, উত্তরী শূকরলেজি বানর, রেসাস বানর, আসামি বানর ও লজ্জাবতী বানর (ধীর লরিস)। এ ছাড়া মায়া হরিণ (ঘেউ করা হরিণ), কমলা-পেটা হিমালয়ি কাঠবিড়ালিসহ ~২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী (ভ্রমণ-বিবরণ)।
  • পাখি ও অন্যান্য: নথিভুক্ত পাখি ২৪৬–২৪৯ প্রজাতি — ধনেশ (ওরিয়েন্টাল পাইড হর্নবিল), কালিজ ফেজ্যান্ট, নীলদাড়ি সুইচোরা ও লালবুক ট্রোগন পাখিপ্রেমীদের বড় আকর্ষণ; ২০টির বেশি জাতের অর্কিড ফোটে বর্ষায়। সাফারি-ধাঁচের দেখা মিলবে না — এ বনে প্রাণী দেখা ধৈর্য, নীরবতা ও ভাগ্যের খেলা; কান পেতে উল্লুকের ডাক শোনাটাই অনেকের কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।

বনের ভেতরের মানুষ: খাসিয়া পুঞ্জি

উদ্যানের সীমানার ভেতরেই দুটি খাসিয়া গ্রাম — মাগুরছড়া পুঞ্জি (৪০ পরিবার) ও লাওয়াছড়া পুঞ্জি (২৩ পরিবার); আশপাশে তিপরা সম্প্রদায়ের গ্রামও আছে (ট্রিপঅ্যাডভাইজর)। খাসিয়াদের জীবিকা পানের বরজ — যা তাঁদের সংস্কৃতিতে অত্যন্ত পবিত্র: অনুমতি ছাড়া বরজে ঢোকা গুরুতর অভদ্রতা (নিসর্গ-প্রকল্পের গবেষণা-প্রতিবেদনে প্রধান নিজে অভিযোগ করেছেন)। পুঞ্জি ঘুরতে চাইলে গাইডের মাধ্যমে, সম্মতি নিয়ে — এই নিয়মটা মেনে চললে অভিজ্ঞতা দুপক্ষের জন্যই সুন্দর হয়।

ক্ষত ও সতর্কবার্তা: মাগুরছড়ার আগুন

এই বনের ইতিহাসে একটি কালো দিন আছে — ১৯৯৭ সালের ১৪ জুন পাশের মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্রে কূপ বিস্ফোরণে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পশ্চিম ভানুগাছ বনের ~৭০০ একর পুড়ে যায়; আগুন জ্বলতে থাকে প্রায় দুই সপ্তাহ (ডেইলি স্টার)। ক্ষতিপূরণ বিতর্কের বছরের পর বছর পরও মীমাংসা হয়নি বলে প্রতিবেদনে এসেছে। ২০০৮ সালে এক মার্কিন কোম্পানির ত্রিমাত্রিক সিসমিক জরিপের অনুমতি নিয়েও পরিবেশবাদীদের তীব্র আপত্তি ওঠে — ভূমিকম্প-তরঙ্গে আতঙ্কিত এক উল্লুকের বিদ্যুৎ-তারে মৃত্যুর খবর পর্যন্ত পত্রিকায় আসে। ভ্রমণকারী হিসেবে এই ইতিহাস জানা জরুরি — বনটা শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, টিকে থাকার লড়াইয়েরও ময়দান।

ট্রেইল ও ঘোরার ধরন

  • তিনটি হাঁটার ট্রেইল — প্রায় আধঘণ্টা, এক ঘণ্টা ও তিন ঘণ্টার (ভ্রমণ-গাইড সূত্রে); দীর্ঘ ট্রেইলটি পুঞ্জি ও গভীর বনের দিকে যায়। গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক না হলেও স্থানীয় ইকো-গাইড নিলে উল্লুক-হনুমানের অবস্থান খুঁজে পাওয়া অনেক সহজ (গাইড ফি ~৩০০ টাকা/ঘণ্টা — বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২০২৩)।
  • রেললাইন: ঢাকা–সিলেট রেলপথ বনের বুক চিরে গেছে — সবুজ সুড়ঙ্গের মাঝে ট্রেন আসার দৃশ্য ছবির জন্য বিখ্যাত; তবে লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলা বিপজ্জনক ও নিষেধ — পাশের নিরাপদ জায়গা থেকে তুলুন।
  • প্রবেশ ফি (২০২৩-এর তথ্য, বদলাতে পারে): প্রাপ্তবয়স্ক ৫০ টাকা, ছাত্র/শিশু ২০ টাকা, বিদেশি ৫০০ টাকা, গাড়ি পার্কিং ২৫ টাকা (বাংলাদেশ প্রতিদিন)। বনের ভেতরে রাতে থাকার ব্যবস্থা নেই।
  • সেরা সময়: ভোরবেলা — উল্লুকের ডাক ও প্রাণীর সক্রিয়তা তখনই সবচেয়ে বেশি; শীতে আবহ আরামদায়ক; বর্ষায় বন সবচেয়ে জীবন্ত তবে জোঁকের উপদ্রব বেশি (লবণ/মোজা সাথে রাখুন)।

যাওয়া, থাকা, কম্বিনেশন

শ্রীমঙ্গল থেকে সিএনজিতে ~২০–৩০ মিনিট; দিনের জন্য সিএনজি রিজার্ভ (সাম্প্রতিক ভাড়া-তথ্যে ১,২০০–১,৫০০ টাকা/দিন — দরদামে বদলায়)। থাকা শ্রীমঙ্গল শহর বা বনের বাইরের ইকো-কটেজগুলোতে। একই দিনে চা জাদুঘর ও বিটিআরআই (ভানুগাছ সড়কেই কাছাকাছি) অথবা মাধবপুর লেক মেলানো যায়; বনের প্রবেশপথে ছোট চা-নাশতার দোকান আছে, ভালো খাবার শ্রীমঙ্গল শহরে।

নমুনা অর্ধদিনের সূচি

  • সকাল ৭টা: প্রবেশপথে টিকিট ও গাইড নিয়ে দীর্ঘ ট্রেইলে — উল্লুকের ডাকের সময়টা মিস করবেন না।
  • সকাল ১০টা: খাসিয়া পুঞ্জির প্রান্তে (অনুমতি সাপেক্ষে) পান-বরজ দেখা।
  • দুপুর: শ্রীমঙ্গল ফিরে খাবার; বিকেলে চা জাদুঘর।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

উল্লুক কি নিশ্চিত দেখা যায়?

নিশ্চয়তা নেই — তবে ভোরে গাইডসহ দীর্ঘ ট্রেইলে গেলে ডাক শোনা প্রায় নিশ্চিত, দেখা পাওয়ার সম্ভাবনাও দেশের মধ্যে এখানেই সবচেয়ে বেশি।

বনের ভেতরে থাকা যায় কি?

না — উদ্যানে রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ; থাকতে হয় শ্রীমঙ্গল বা বাইরের কটেজে (বাংলাদেশ প্রতিদিন)।

বর্ষায় যাওয়া ঠিক হবে?

বন সবচেয়ে সবুজ ও অর্কিডের মৌসুম বর্ষাই; তবে জোঁক ও পিচ্ছিল পথের প্রস্তুতি (মোজা, লবণ, রেইনকোট) নিয়ে যান।

শেষকথা

মাত্র ১,২৫০ হেক্টরে এত প্রাণের ঘনত্ব — লাওয়াছড়া বাংলাদেশের প্রকৃতি-ভ্রমণের সবচেয়ে সহজলভ্য রত্ন। পরের পোস্টে এই বনেরই পাশের আরেক রহস্য: হামহাম জলপ্রপাতের ট্রেকিং-গাইড।