• 01 Nov, 2026

নেত্রকোণা শহর ভ্রমণ গাইড — নামের দুটি প্রচলিত ব্যাখ্যা, ১৮৮২-র মহকুমা থেকে ১৯৮৪-র জেলা, প্রথম আলোর প্রতিবেদনে মগড়া নদীর স্টিমার-যুগের গৌরব ও ৪৮ কোটি টাকার পুনঃখনন প্রকল্প এবং সাতপাই কালীবাড়ী, রুমীর মাজার ও কবিতাকুঞ্জের বিবরণ।

ময়মনসিংহ বিভাগের উত্তর-পূর্বের জেলা নেত্রকোণা — ময়মনসিংহ শহর থেকে এগিয়ে এলে এই জেলাই বিভাগের শেষ প্রান্ত; উত্তরে মেঘালয়ের পাহাড়, দক্ষিণে হাওরের দেশ। জেলা শহরটি ছোট, শান্ত — আর এর বুক চিরে বয়ে গেছে যে নদী, সেই মগড়া-ই শহরের ইতিহাস, দুঃখ আর এখন নতুন আশা। এই গাইডে শহর আর নদী দুটোই।

নামের গল্প ও জেলার পরিচয়

নাম নিয়ে দুটি প্রচলিত ব্যাখ্যা আছে। একটি হলো, শহরের ~৭–৮ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমের নাটোরকোণায় ইংরেজরা জরিপ শুরু করে সেখানেই মহকুমা সদর বসায়; তাদের বিকৃত উচ্চারণে 'নাটোরকোণা' হয় 'নেত্রকোণা'। অন্যটি আরও কাব্যিক: মগড়া নদী শহরের বুকে চোখের (নেত্র) মতো বাঁক নিয়েছে — সেখান থেকেই নাম (বাংলাকোষ)। নেত্রকোণা মহকুমা গঠিত হয় ১৮৮২ সালে, জেলা হয় ১৯৮৪ সালে; আয়তন ২,৭৯৪.২৮ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা দশটি, পৌরসভা পাঁচটি (বাংলাপিডিয়া)। গারো, হাজং, হদি, বানাই — আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসত এই জেলার পুরোনো চরিত্র। মুক্তিযুদ্ধে পুরো জেলা ছিল ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে; যুদ্ধের শুরুতেই মুক্তিযোদ্ধারা ঠাকুরকোণা রেল সেতু উড়িয়ে দিয়েছিলেন (বাংলাপিডিয়া)। ঢাকা থেকে দূরত্ব প্রায় ১৬২ কিলোমিটার (ভ্রমণ-তথ্য)।

মগড়া নদী: স্টিমারের নদী, এখন পুনরুদ্ধারের অপেক্ষায়

মগড়ার উৎপত্তি ফুলপুরের ধলাই নদের দক্ষিণমুখী প্রবাহ থেকে; শহর পেরিয়ে আটপাড়া-মদন হয়ে কিশোরগঞ্জের ইটনায় গিয়ে মিশেছে ধনু নদে (পাউবো; ইনামুল হকের 'বাংলাদেশের নদ-নদী')। পাউবোর হিসাবে নদীর মোট দৈর্ঘ্য ১৫৫ কিলোমিটার (১১৬ কিলোমিটারই নেত্রকোণা জেলায়), শহরের ভেতরের অংশ ~৭ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৩৮ মিটার। ছয় দশক আগেও এই নদীতে জোয়ার-ভাটা হতো, পালতোলা নৌকা, স্টিমার ও লঞ্চ চলত — মোক্তারপাড়ার প্রবীণ ছড়াকার শ্যামলেন্দু পালের স্মৃতিচারণে সেই প্রমত্ত মগড়ার ছবি এখনো জ্বলজ্বলে (প্রথম আলো, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। ⚠ কিন্তু আজকের চিত্র কঠিন: দখলে দুই পাড়ে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা, বাসা-বাজার-কারখানার বর্জ্য আর পৌরসভার নর্দমার পানিতে নদী অনেকটা নিশ্চল ও দূষিত (প্রথম আলো)। তবে আশার খবর সাম্প্রতিক: ৪৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকার প্রকল্পে মগড়ার ৪১ কিলোমিটার পুনঃখনন এবং শহরের অংশে দুই পাড়ে হাঁটার পথ ও সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে; সরকারি নথিতে বাস্তবায়নকাল নভেম্বর ২০২৫ – জুন ২০২৭, খনন শুরু হওয়ার কথা চলতি শুষ্ক মৌসুমে সাতটি প্যাকেজে (প্রথম আলো)। অর্থাৎ ২০২৭-এর মধ্যে এই পাড়ের চেহারা বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা বাস্তব — ভ্রমণে গেলে কাজের অগ্রগতি নিজের চোখে দেখে আসতে পারবেন।

শহরে যা দেখবেন

মগড়ার পাড় ধরে হাঁটাই শহর দেখার সেরা উপায়। সাতপাই কালীবাড়ী শহরের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র — মহালয়ার ভোরে (১০ অক্টোবর ২০২৬) এখানে দেড়শ শিল্পীর সম্মিলিত আগমনী গান আর দুর্গা-মহিষাসুরের নাট্য পরিবেশিত হয়েছে (একাত্তর টিভি)। পাশেই সরকারি কলেজ-সংলগ্ন জেলা স্টেডিয়াম (১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত, ধারণক্ষমতা ~১৫,০০০; ২০১৮ সালে ৩৫ কোটি টাকায় সংস্কার — বাংলা উইকিপিডিয়া)। শহর থেকে সিএনজিতে ~৩০ মিনিটে মদনপুর গ্রামে শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমীর মাজার — প্রতি বৃহস্পতিবার সেখানে ঢোল বাজে, দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন (দ্য ডেইলি স্টার)। মগড়ার পাড়ে মালনী এলাকায় কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতাকুঞ্জ — প্রায় ২,০০০ কবিতার বইয়ের পাঠঘর, ৯০ দেশের কবিদের বই ও ~৭০ জন কবির ছবি; পেছনে অতিথিশালাও আছে (দ্য ডেইলি স্টার)। আর মিষ্টিমুখের জন্য জেলাজুড়ে নামকরা গয়নাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের 'বালিশ মিষ্টি' (বাংলাভাইব) — আকারে বালিশের মতো বলেই এই নামে পরিচিত হওয়ার গল্প শোনা যায়।

ভ্রমণ তথ্য

যাওয়া: ঢাকার মহাখালী/সায়েদাবাদ থেকে সরাসরি বাসে নেত্রকোণা; ট্রেনেও আসা যায় (ঢাকা–মোহনগঞ্জ লাইন শহর ছুঁয়ে যায়)। ভিত্তি হিসেবে শহর: বিরিশিরি-দুর্গাপুর শহর থেকে উত্তরে ~৪০ কিমি — সার্কিটের ঘাঁটি এই শহরই সুবিধাজনক। থাকা-খাওয়া: শহরে সাধারণ মানের হোটেল ও খাবারের দোকান আছে; সকালে মগড়ার পাড় সবচেয়ে সুন্দর। কখন: শীতকালে হাওর শুকিয়ে সবুজ, গ্রীষ্মে পূর্ণ জল — দুটোই আলাদা অভিজ্ঞতা; মগড়ার খননকাজ চলাকালে (২০২৬–২৭) পাড়ের কিছু অংশে কাজ চলতে পারে। প্রতিবেশী শেরপুরের রাজার পাহাড় এই বিভাগেরই আরেক পাহাড়ি ঠিকানা — সার্কিটে মেলানো যায়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

নেত্রকোণা জেলা কবে প্রতিষ্ঠিত?

মহকুমা ১৮৮২ সালে; জেলা ১৯৮৪ সালে (বাংলাপিডিয়া)।

নামের উৎপত্তি কী?

দুটি প্রচলিত ব্যাখ্যা — নাটোরকোণার বিকৃত উচ্চারণ, অথবা মগড়ার চোখ-আকৃতির বাঁক (বাংলাকোষ)।

মগড়া নদীর দৈর্ঘ্য কত?

পাউবোর হিসাবে ১৫৫ কিলোমিটার, যার ১১৬ কিলোমিটার নেত্রকোণা জেলায় (প্রথম আলো)।

মগড়া পুনরুদ্ধার প্রকল্পের অবস্থা কী?

৪৮.৩৯ কোটি টাকায় ৪১ কিমি পুনঃখনন ও পাড় সৌন্দর্যবর্ধন; সময়কাল নভেম্বর ২০২৫ – জুন ২০২৭ (প্রথম আলো, সেপ্টেম্বর ২০২৬)।

শহরে কী দেখব?

সাতপাই কালীবাড়ী, জেলা স্টেডিয়াম, রুমীর মাজার, কবিতাকুঞ্জ — আর বালিশ মিষ্টি (ডেইলি স্টার; বাংলা উইকিপিডিয়া)।

ঢাকা থেকে দূরত্ব কত?

প্রায় ১৬২ কিলোমিটার (ভ্রমণ-তথ্য)।

শেষকথা

নেত্রকোণা এমন শহর, যার গল্প তার নদীর সঙ্গেই বাঁধা — স্টিমারের যুগের গৌরব, দখল-দূষণের দীর্ঘ অধ্যায়, আর এখন খননযন্ত্রের শব্দে নতুন প্রত্যাশা। বিভাগের পাহাড়-হাওরের বিখ্যাত ঠিকানাগুলোতে যাওয়ার আগে এই শহরে এক সকাল কাটিয়ে গেলে পুরো জেলাটাকে বোঝা সহজ হয়।