টাঙ্গুয়ার হাওর সফরের সবচেয়ে বেশি ছবি তোলা হয় সম্ভবত এই এক লেকেই। তাহিরপুরের টেকেরঘাটে, মেঘালয় সীমান্তের গায়ে, পাথুরে দেয়ালের ভেতর গাঢ় নীলচে-সবুজ পানি — প্রথম দেখায় মনে হবে পাহাড়ি কোনো হ্রদ। অথচ এটি প্রাকৃতিক লেক নয় মোটেই: এটি একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া চুনাপাথর খনির গর্ত, যেখানে ভূগর্ভস্থ পানি জমে তৈরি করেছে আজকের নীলাদ্রি লেক।
তিনটি নাম, একটি লেক
- শহীদ সিরাজ লেক — এটাই সরকারি/আসল নাম: মুক্তিযুদ্ধের শহীদ গেরিলা যোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম, বীর বিক্রম-এর নামে নামকরণ করা হয়েছে লেকটির; লেকের কাছেই তার স্মৃতি-চিহ্ন খুঁজে পাবেন দর্শনার্থীরা।
- নীলাদ্রি লেক — পর্যটক-সমাজের দেওয়া নাম, পানির গাঢ় নীল রঙ থেকে; জনপ্রিয়তায় এই নামটাই এগিয়ে।
- টেকেরঘাট পাথর কোয়ারি — স্থানীয়দের কাছে এই নামেই পরিচিত।
- আর সৌন্দর্যের জন্য ভ্রমণকারীরা একে বলেন ‘বাংলার কাশ্মীর’ (ভ্রমণগাইড/ডেইলি স্টার)।
খনির ইতিহাস: সিমেন্ট কারখানা থেকে লেক
এই লেকের গল্প বাংলাদেশের শিল্প-ইতিহাসের সঙ্গে বাঁধা:
- ছাতকের আসাম বেঙ্গল সিমেন্ট ফ্যাক্টরির জন্য চুনাপাথর আসত মেঘালয়ের পাহাড় থেকে; ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর সেই সরবরাহ জটিল হয়ে গেলে দেশের ভেতরে উৎস খোঁজা শুরু হয় (যুগান্তর)।
- ১৯৬০–৬১ সালে তাহিরপুর সীমান্তের টেকেরঘাটে জরিপে মেলে বিশাল মজুদ — ৩২৭ একর প্রকল্প-এলাকা; একাডেমিক গবেষণা অনুযায়ী যাচাইকৃত রিজার্ভ ছিল প্রায় ১৩২.৫৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন।
- বিসিআইসির (পরে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির অধীনে) প্রকল্পে ১৯৬৬ সাল থেকে পুরোদমে মাইনিং শুরু হয় (কিছু স্থানীয় বর্ণনায় এখানে ১৯৪০-এর দশকেই প্রথম উত্তোলনের কথা আছে); ১৯৮০ সাল নাগাদ তোলা হয় ~১৬.৬ লাখ মেট্রিক টন পাথর (একাডেমিক গবেষণা)।
- অব্যবস্থাপনা আর লোকসানের অভিযোগের মধ্যে ১৯৯৬ সালে খনি বন্ধ হয়ে যায়; ~৪০০ কর্মীকে বিসিআইসির অন্য প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে নেওয়া হয়, প্রকল্পের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটে ২০০৭ সালে।
- পরিত্যক্ত গর্তে পানি জমে জন্ম নেয় লেক — আর যোগাযোগব্যবস্থা ভালো হওয়ার পর গত দশকে এটি হয়ে উঠেছে তাহিরপুর সার্কিটের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্পট।
ইতিহাসের এই স্তরটা জানা থাকলে লেকের পাথুরে খাড়া পাড়গুলো আর ‘অদ্ভুত সুন্দর শুধু’ মনে হয় না — মনে হয় একটা শিল্পযুগের কবরস্থান, যার ওপর প্রকৃতি দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছে।
লেকে কী করবেন
- নৌকায় ঘোরা ও কায়াকিং: লেকের নীল পানিতে ছোট নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়; কায়াকিংয়ের ব্যবস্থাও আছে কিছু অপারেটরের (ভ্রমণট্রিপস)। পাথুরে পাড়ের গা ঘেঁষে ভেসে যাওয়া — এই সফরের সেরা ফটো-পয়েন্টগুলো নৌকা থেকেই।
- টিলায় বসে থাকা: একপাশে সবুজ ঘাসে মোড়া ছোট ছোট টিলা, অন্যপাশে বিশাল পাহাড় — ঘাসে বসে ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়ার জায়গা; উত্তর পাশের টিলায় ঘোড়ায় চড়ার ব্যবস্থাও আছে (ভ্রমণট্রিপস)।
- ক্যাম্পিং ও সন্ধ্যা: অনেকে লেকপাড়ে ক্যাম্প করেন; সন্ধ্যায় পাহাড়ের আলো-ছায়া পানিতে পড়লে দৃশ্যটা সম্পূর্ণ বদলে যায়।
সতর্কতা: এই লেক অত্যন্ত গভীর
নীলাদ্রি খনির গর্ত — পাড়ের কাছ থেকেই পানি হঠাৎ গভীর হয়ে গেছে (ভ্রমণগাইড)। সাঁতার জানলেও লাইফ জ্যাকেট ছাড়া পানিতে নামা ঝুঁকিপূর্ণ; অপরিচিত জায়গায় ঝাঁপ দেওয়া একেবারেই নয়। শিশুদের পাড়ে চোখে চোখে রাখুন। সীমান্তবর্তী এলাকা বলে বিজিবির নির্দেশনা মেনে চলুন — বিশেষ করে পাহাড়ি সীমান্তের দিকে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
যাওয়া, থাকা, খাওয়া
- রুট: সুনামগঞ্জ/তাহিরপুর থেকে বাইক বা নৌকায় টেকেরঘাট; টাঙ্গুয়ার হাউসবোট সফরে দ্বিতীয় দিন টেকেরঘাটে নামাই নিয়ম — ঘাট থেকে লেক হাঁটাপথে। স্বতন্ত্র সফরে সুনামগঞ্জ থেকে লাউড়ের গড়-বারেক টিলা হয়ে পিচঢালা রাস্তায় পৌঁছানো যায়।
- থাকা: বড়ছড়া বাজারে গেস্ট হাউস (২০০–৪০০ টাকা) ও লেকের কাছে পুরনো চুনাপাথর-প্রকল্পের গেস্ট হাউসের কথা ভ্রমণগাইড উল্লেখ করে; বেশিরভাগ পর্যটক রাত কাটান হাউসবোটে বা তাহিরপুরে।
- খাওয়া: টেকেরঘাট বাজারে সাধারণ দেশি হোটেল; মেনুতে হাওরের মাছ মিললে লুফে নিন।
- সেরা সময়: হাওর-সফরের সঙ্গে জুলাই–অক্টোবর; শীতে অতিথি পাখির টানে আলাদা আমেজ — লেক বছরজুড়েই খোলা।
হাফ-ডে নমুনা সূচি
- সকাল ৭টা: টেকেরঘাট ঘাটে নেমে লেকে নৌকা/কায়াক (১–১.৫ ঘণ্টা)।
- সকাল ৯টা: টিলায় উঠে প্যানোরামা ও ছবি; শহীদ সিরাজের স্মৃতি-স্থান ঘুরে দেখা।
- দুপুর: টেকেরঘাট বাজারে খেয়ে লাকমাছড়া/বারেক টিলার দিকে অগ্রসর।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
লেকে ঢুকতে টিকিট লাগে?
লেকটি খোলা পাবলিক এলাকা — সরকারি টিকিটের ব্যবস্থা নেই; নৌকা/কায়াক ভাড়া আলাদা করে দরদাম করে নিতে হয়।
‘নীলাদ্রি’ কার দেওয়া নাম?
পর্যটক-সমাজের; পানির নীল রঙ থেকে। সরকারি নাম শহীদ সিরাজ লেক — সাইনবোর্ডে দুটোই দেখতে পাবেন।
এখানে রাত কাটানো যায়?
হাউসবোট টেকেরঘাটের কাছেই রাত থাকে; স্থলে গেস্ট হাউস সাধারণ মানের — প্রত্যাশা সেই অনুযায়ী রাখুন।
শেষকথা
টেকেরঘাট শেখায় — শিল্প মরলেও জায়গা মরে না, যদি প্রকৃতি আর মানুষ মিলে তাকে নতুন জীবন দেয়। তাহিরপুর সার্কিটের বাকি দুই মহারথী টাঙ্গুয়ার হাওর ও জাদুকাটা-বারেক টিলা গাইড দুটি সঙ্গে রাখুন; পরের পোস্টে শিমুল বাগান।