• 31 Oct, 2026

বরিশাল শহরের বগুড়া রোডে ১৯০৩ সালের অক্সফোর্ড মিশন এপিফ্যানি গির্জা — গ্রিক শৈলীর লাল ইটের স্থাপত্য, ৩৫ একর প্রাঙ্গণে ১৩টি পুকুর ও স্কুল-হাসপাতাল; সিস্টার এডিথ ল্যাংরিজ ও ফাদার স্ট্রংয়ের ইতিহাস এবং দর্শনার্থীদের প্রবেশ-নিয়মের সৎ নির্দেশনা।

বরিশাল শহরের বগুড়া রোড ধরে হাঁটলে হঠাৎ চোখে পড়বে সারি সারি পাম গাছের পেছনে বিশাল লাল ইটের এক স্থাপনা — বাইরে থেকে পাঁচতলা মনে হলেও আসলে একতলা এই গির্জাটি বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর ধর্মীয় স্থাপত্যগুলোর একটি। নাম এপিফ্যানি গির্জা, তবে সবাই চেনে অক্সফোর্ড মিশন চার্চ কিংবা "লাল গির্জা" নামে।

ইতিহাস: অক্সফোর্ড থেকে কীর্তনখোলার পাড়ে

ইংল্যান্ডভিত্তিক অ্যাংলিকান মিশন "অক্সফোর্ড মিশন" ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বরিশাল অঞ্চলে কাজ শুরু করে — ১৮৯৫ সালে গঠিত হয় ব্রাদারহুড অব দ্য এপিফ্যানি; ১৯০২ সালে ফাদার স্ট্রংয়ের নির্দেশনায় গড়ে ওঠে সিস্টারহুড, যার নেতৃত্বে ছিলেন সিস্টার এডিথ ল্যাংরিজ (এডিথ ল্যাংরিজের জীবনী — ইংরেজি উইকিপিডিয়া/বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড)। গির্জাটি প্রতিষ্ঠিত হয় সিস্টার এডিথের আঁকা নকশার (স্কেচ) ভিত্তিতে — উদ্বোধন ১৯০৩ সালের ২৬ জানুয়ারি; ব্রাদারহুডের প্রধান ফাদার ই. এল. স্ট্রং নকশার চূড়ান্ত রূপ ও নির্মাণ তত্ত্বাবধান করেন, দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শেষ হয় ১৯০৭ সালে; প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক ফ্রেডেরিক ডগলাস (ঢাকা ট্রিবিউন/পর্যটন বোর্ড)। বর্তমানে গির্জাটি চার্চ অব বাংলাদেশের বরিশাল ধর্মপ্রদেশের (ডায়োসিস) এপিফ্যানি ক্যাথেড্রাল (বাংলা উইকিপিডিয়া)। প্রসঙ্গত, গির্জাটির অবস্থান কবি জীবনানন্দ দাশের বাড়ির ঠিক পাশে, জীবনানন্দ দাশ সড়কে (ঢাকা ট্রিবিউন) — বরিশাল শহরের সফরে দুটি ঠিকানা একসঙ্গে দেখা যায়।

স্থাপত্য: গ্রিক শৈলী, ৪০টি খিলান, একতলায় পাঁচতলার উচ্চতা

গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত লাল ইটের গির্জাটি প্রায় ৩৫ একর জমির ওপর, উঁচু প্রাচীর ও পাম গাছের সারিতে ঘেরা (পর্যটন বোর্ড)। এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম ও বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ গির্জা হিসেবে গণ্য করা হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া/পর্যটন বোর্ড)। ভবনটি একতলা হলেও উচ্চতায় প্রায় পাঁচতলার সমান; ভেতরে সুবিশাল প্রার্থনা কক্ষ, যার ছাদ ধরে রেখেছে ৪০টি খিলানপথ (এশিয়ান এজ/আদার ব্যাপারী)। ভেতরের কাজে কাঠের খোদাই আর মার্বেল টাইলসের মেঝে, মূল বেদির ওপর বিশাল ক্রুশ। দূর থেকে গির্জাটিকে দেখলে রেলগাড়ির ইঞ্জিনের কথা মনে হয় — স্থানীয় বর্ণনায় এই রূপকটি প্রচলিত (আদার ব্যাপারী)। প্রাঙ্গণের ভেতরে রয়েছে ১৩টি পুকুর, অক্সফোর্ড মিশন প্রাইমারি ও হাই স্কুল, হাসপাতাল (মেডিকেল সেন্টার), লাইব্রেরি, ছাত্র-ছাত্রী হোস্টেল, এতিমখানা, খেলার মাঠ, ফুলের বাগান এবং দীঘির প্রতিবিম্বে ভাসা ফাদার্স হাউস ও মাদার্স হাউস (আদার ব্যাপারী/পর্যটন বোর্ড)। আদার ব্যাপারীর বর্ণনায় গির্জার বড় ঘণ্টাটিকে এশিয়ার বড় ঘণ্টাগুলোর একটি বলা হয়েছে, যা প্রতিদিন সাতবার বাজানো হয়। শত বছরের বেশি সময় ধরে অসংখ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ পেরিয়েও গির্জাটি সংরক্ষিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে প্রায় অবিকৃত রূপে টিকে আছে (পর্যটন বোর্ড)।

দর্শনার্থীদের জন্য জরুরি কথা: প্রবেশ সীমিত

একটি সৎ সতর্কতা আগেই জেনে রাখুন: এই গির্জা-প্রাঙ্গণ সাধারণ পর্যটনের জন্য উন্মুক্ত নয়। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে গির্জার তত্ত্বাবধায়ক (সুপারভাইজার) বেনেডিক্ট বিমল বেপারী জানিয়েছেন — নিরাপত্তা ও ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষায় কেবল খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদেরই প্রাঙ্গণে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়; প্রাঙ্গণটি সবার জন্য খোলা নয়। তাই অন্য ধর্মের দর্শনার্থীদের জন্য অভিজ্ঞতাটি মূলত বাইরে থেকে — বগুড়া রোড/জীবনানন্দ দাশ সড়ক থেকে প্রাচীরের ওপারে লাল স্থাপত্যটি দেখা ও ছবি তোলা। প্রার্থনার সময়ে গেলে দূর থেকে ঘণ্টার ধ্বনি শোনার সৌভাগ্য হতে পারে। বিশেষ প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আগাম যোগাযোগ করে অনুমতি মিলতে পারে, তবে নিশ্চয়তা নেই — এই প্রত্যাশা নিয়েই যাবেন। মেহেরপুরের বল্লভপুর মিশনে চার্চ অব বাংলাদেশের মিশন-ঐতিহ্যের আরেক অধ্যায় দেখা যায়, যেখানে হাসপাতাল-সেবার দীর্ঘ ইতিহাস জড়িত।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

অক্সফোর্ড মিশন চার্চ কোথায়?

বরিশাল শহরের বগুড়া রোডে, কবি জীবনানন্দ দাশ স্ট্রিটে — জীবনানন্দ দাশের বাড়ির পাশে (ঢাকা ট্রিবিউন)।

গির্জাটি কবে, কারা নির্মাণ করেন?

সিস্টার এডিথ ল্যাংরিজের নকশায় ১৯০৩ সালে প্রতিষ্ঠা (উদ্বোধন ২৬ জানুয়ারি ১৯০৩); ফাদার ই. এল. স্ট্রংয়ের তত্ত্বাবধানে দ্বিতীয় পর্যায় শেষ হয় ১৯০৭ সালে (পর্যটন বোর্ড)।

গির্জাটি এত বিখ্যাত কেন?

গ্রিক শৈলীর লাল ইটের বিশাল স্থাপত্য — দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম গির্জা হিসেবে গণ্য; একতলা ভবনের পাঁচতলা-সমান উচ্চতা, ৪০টি খিলান আর ৩৫ একর সবুজ প্রাঙ্গণের জন্য।

সাধারণ দর্শনার্থী কি ভেতরে যেতে পারেন?

সাধারণত না — তত্ত্বাবধায়কের ভাষ্য অনুযায়ী নিরাপত্তা ও ধর্মীয় পবিত্রতার জন্য শুধু খ্রিস্টানদের প্রবেশ অনুমোদিত (ঢাকা ট্রিবিউন)। বাইরে থেকে দেখা ও আগাম অনুমতির চেষ্টাই বিকল্প।

প্রাঙ্গণে আর কী আছে?

১৩টি পুকুর, প্রাইমারি ও হাই স্কুল, হাসপাতাল, লাইব্রেরি, হোস্টেল, এতিমখানা, খেলার মাঠ ও ফাদার্স/মাদার্স হাউস (আদার ব্যাপারী/পর্যটন বোর্ড)।

শেষকথা

ভেতরে ঢুকতে না পারলেও বগুড়া রোড থেকে দেখা লাল গির্জার এই ঝলক বরিশাল ভ্রমণের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত — এক শ বছরের বেশি ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সেবার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনা শহরটির আত্মারই অংশ। জীবনানন্দের বাড়ির সঙ্গে জুড়ে এই পাড়াটি বরিশালের সবচেয়ে ঐতিহ্যঘন হাঁটাপথ।