ঢাকা–সিলেট মহাসড়কে মাধবপুর পেরোলেই রাস্তার দুপাশে হঠাৎ বদলে যায় দৃশ্য — ধানক্ষেত ও চা-ঝোপের বদলে সারি সারি লম্বা গাছের গভীর সবুজ করিডর। এটাই শাহজীবাজার রাবার বাগান। আর সেই বাজারের নামের গভীরে লুকিয়ে সাতশ বছরের পুরনো আরেক গল্প — শাহজালালের সফরসঙ্গী শাহ সোলেমান ফতেহ গাজীর দরগাহ। হবিগঞ্জ জেলার এই সপ্তম ও শেষ পোস্টে দুটোই একসঙ্গে।
রাবার বাগান: ‘সাদা সোনা’র বাগান
- পরিচয় ও আয়তন: বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএফআইডিসি) সিলেট জোনের চারটি সরকারি রাবার বাগানের একটি শাহজীবাজার। বিএফআইডিসির শ্রীমঙ্গল কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী এর আয়তন ২,১০৪ একর (বণিক বার্তা); জেলা-পরিসংখ্যানভিত্তিক অন্য তালিকায় ২,০০৪ একরও দেখা যায়। বাগানটি মূলত মাধবপুরে হলেও এর বিস্তার চুনারুঘাট দিকেও গেছে — কোনো কোনো তালিকায় নাম এসেছে ‘শাহজীবাজার-চুনারুঘাট’।
- ইতিহাস: ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিএফআইডিসি স্বাধীনতার পর সাতগাঁও (১৯৭১), রূপাইছড়া (১৯৭৭) ও শাহজীবাজার (১৯৭৮) বাগান গড়ে তোলে; সরকারি গেজেটের সারণিতে শাহজীবাজারের রোপণকাল ১৯৮০–৮৮ ও উৎপাদন-শুরুর বছর ১৯৮৮ হিসেবে এসেছে — অর্থাৎ ধাপে ধাপে সৃজন হয়েছে বছরজুড়ে। চার বাগান মিলে সিলেট জোনে মোট ৮,৯৪০ একর ও প্রায় সাড়ে আট লাখ রাবার গাছ (বণিক বার্তা)।
- বাস্তবতা — বার্ধক্য ও পুনরোপণ: রাবার গাছ রোপণের ~৭ বছর পর থেকে কষ (ল্যাটেক্স) দেয়, উৎপাদন ভালো থাকে মোটামুটি ৩২ বছর বয়স পর্যন্ত। কিন্তু চার বাগানের ৬০ শতাংশ গাছের বয়সই ৫০ বছরের বেশি — ফলে উৎপাদনক্ষম গাছ এখন সংখ্যায় সংখ্যালঘু (বণিক বার্তার শিরোনাম অনুযায়ী মাত্র ~২৫ শতাংশ)। পুরনো গাছ কেটে মালয়েশীয় ও শ্রীলঙ্কান উচ্চফলনশীল ক্লোনের চারা দিয়ে পুনরোপণ চলছে; আমদানি-প্রতিযোগিতায় খাতটি লোকসান-লাভের দোলাচলে আছে বলেও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসেছে। আটের দশকে যাকে ‘সাদা সোনা’ বলা হতো, তার এই সংগ্রামের ছবিটাও বাগান ঘুরলে চোখে পড়বে — সবুজের মধ্যে মধ্যে ফাঁকা প্লট আর নতুন চারার সারি।
- যা দেখবেন: দুই ধারে রাবার গাছের সুশৃঙ্খল সারি, গাছের গায়ে টিনের/প্লাস্টিকের কাপে জমা সাদা ল্যাটেক্স, ভোরবেলা শ্রমিকদের কষ-সংগ্রহের কাজ (সাধারণত খুব ভোরে ট্যাপিং হয়)। এটি সাজানো পর্যটনকেন্দ্র নয়, চলমান কর্মক্ষেত্র — বাগান অফিসে জানিয়ে/অনুমতি নিয়ে ভেতরে ঘোরাই শোভন ও নিরাপদ। পাশেই শাহজীবাজার পাওয়ার প্ল্যান্ট এলাকার শিল্প-চরিত্র মনে করিয়ে দেয়, জায়গাটা শুধু প্রকৃতি নয় — কর্মসংস্থানেরও মানচিত্র।
ফতেহ গাজীর দরগাহ: বারো আউলিয়ার একজন
- পরিচয়: তাঁর আসল নাম সোলেমান, বাগদাদ থেকে আসা; পুরো নাম শাহ সোলেমান ফতেহ গাজী আল-বাগদাদী। তিনি ছিলেন হযরত শাহজালালের অন্যতম সফরসঙ্গী, আর মাধবপুর এলাকায় ইসলাম প্রচারের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
- তরফ বিজয়ে ভূমিকা: ১৩০৩ সালে শ্রীহট্ট বিজয়ে অংশ নেওয়ার পর, তুঙ্গাচল/তরফ জয়ে সিপাহসালার নাসির উদ্দিনের সঙ্গে পাঠানো বারোজন আউলিয়ার একজন ছিলেন তিনি — যাঁদের গল্প আগের পোস্টে মুড়ারবন্দে পড়েছেন। রাজা আচক নারায়ণের পলায়নের পর তরফ মুসলিম বাংলায় যুক্ত হয়।
- শেষজীবন ও দরগাহ: উইকিপিডিয়ার তথ্যছক অনুযায়ী তাঁর মৃত্যু হয় তরফের ফতেপুরে (তারিখ হিসেবে ১৪ ডিসেম্বর উল্লেখ আছে, সাল অনুল্লেখিত) এবং সমাধিস্থল শাহজীবাজার দরগাহ, মাধবপুর। আত্মীয়দের মধ্যে আহমদ গাজী ও মসূদ গাজীর নাম পাওয়া যায়। দরগাহটি স্থানীয়দের জিয়ারতের কেন্দ্র — মাজারের রীতি অনুযায়ী এখানেও ওরস-মাহফিলে ভক্তদের সমাগম হয় (নির্দিষ্ট আয়োজনের খবর স্থানীয়ভাবে জেনে নিন)।
একদিনে মাধবপুর বলয়
শাহজীবাজারকে কেন্দ্র করে মাধবপুরের বাকি গন্তব্যগুলো মেলানো সহজ — পশ্চিমে তেলিয়াপাড়ার চা বাগান ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ প্রায় হাতের নাগালে; চুনারুঘাটের দিকে গেলে মুড়ারবন্দ ও সাতছড়ি।
যাওয়া ও টিপস
- রুট: ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের পাশেই শাহজীবাজার — ঢাকা বা সিলেটগামী বাসে সরাসরি নামা যায়; হবিগঞ্জ শহর ও শায়েস্তাগঞ্জ থেকেও বাস/সিএনজি চলে।
- সেরা সময়: ভোরে গেলে ল্যাটেক্স-সংগ্রহের কাজ চোখে পড়ে; বর্ষায় সবুজ সবচেয়ে ঘন, তবে বাগানের ভেতরের কাঁচা পথ কাদায় পিচ্ছিল থাকে।
- শিষ্টাচার: রাবার বাগান কর্মক্ষেত্র — শ্রমিকদের কাজে বাধা না দিয়ে, গাছের কাপ/যন্ত্রপাতি না ছুঁয়ে ঘুরুন; দরগাহে জিয়ারতের সাধারণ শিষ্টাচার (জুতা খোলা, নীরবতা) মেনে চলুন।
অর্ধদিনের নমুনা সূচি
- ভোর ৭টা: রাবার বাগানে ট্যাপিং-দৃশ্য ও সবুজ করিডরে হাঁটা (অনুমতি নিয়ে)।
- সকাল ১০টা: শাহজীবাজার দরগাহে জিয়ারত ও বাজারের চা-নাশতা।
- দুপুর: তেলিয়াপাড়া স্মৃতিসৌধ বা চুনারুঘাটের দিকে যাত্রা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রাবার বাগানে কি যে কেউ ঢুকতে পারে?
আনুষ্ঠানিক টিকিট-ব্যবস্থা নেই; এটি বিএফআইডিসির কর্মস্থল — বাগান অফিস/দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনুমতি নিয়ে ঢোকাই নিয়মসম্মত।
ল্যাটেক্স থেকে কী হয়?
সংগৃহীত কষ প্রক্রিয়াজাত করে রাবার শিট তৈরি হয়; তা থেকে টায়ার, জুতা, ফোমসহ নানা শিল্পপণ্য হয় (যুগান্তরের বাগান-প্রতিবেদন)।
ফতেহ গাজী আর নাসির উদ্দিনের সম্পর্ক কী?
ফতেহ গাজী ছিলেন তরফ-অভিযানে সিপাহসালার নাসির উদ্দিনের সঙ্গে আসা বারো আউলিয়ার একজন (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
শেষকথা
হবিগঞ্জের সাত পোস্টের যাত্রা এখানেই শেষ — বন থেকে শুরু করে রাজবাড়ি, মুক্তিযুদ্ধ, সুলতানি মসজিদ ও সিপাহসালারের মাজার পেরিয়ে তেলিয়াপাড়ার পাশের এই রাবার-সবুজে এসে থামলাম। পরের জেলা মৌলভীবাজার — শ্রীমঙ্গলের চায়ের রাজধানী দিয়ে শুরু হবে নতুন অধ্যায়।