• 01 Nov, 2026

শেরপুর শহর ভ্রমণ গাইড — দশ কাহন কড়ির খেয়া ভাড়া থেকে 'দশকাহনিয়া' নামের উৎপত্তি, গাজী বংশের শেষ শাসক ও সাধক শের আলী গাজীর শাসন ও মাজার, চারু ভবনের গল্প এবং ভেঙে ফেলা হলেও প্রত্নতালিকায় থাকা নয়আনী জমিদার বাড়ির বিস্ময়কর পরিণতি।

লাউচাপড়া যাওয়ার পথে যে শহরটা পড়ে, সেই শেরপুর শুধু গারো পাহাড়ের প্রবেশদ্বার নয় — এর নিজের ইতিহাসই একটা আস্ত উপন্যাস। প্রাচীনকালে কামরূপ রাজ্যের অংশ এই জনপদ ময়মনসিংহ বিভাগের উত্তর-পশ্চিম কোণে, মেঘালয়ের পাদদেশে; ঢাকা থেকে দূরত্ব প্রায় ১৮৩ কিলোমিটার (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

দশ কাহন কড়ির ঘাট থেকে শেরপুর

আকবরের আমলে এই এলাকার নাম ছিল 'দশকাহনিয়া বাজু'। নামের উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যাটা মজার: তখন ব্রহ্মপুত্র পার হতে খেয়াঘাটে বার্ষিক চুক্তিতে দিতে হতো দশ কাহন কড়ি — সেই 'দশ কাহন' থেকেই 'দশকাহনিয়া' (জেলা জজ আদালতের ইতিহাস-পাতা; বাংলা উইকিপিডিয়া)। সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে ভাওয়ালের গাজীরা ঈসা খাঁর বংশধরদের কাছ থেকে এলাকাটি দখল করেন; পরে এখানে থানা-ফৌজদারি কোর্ট, ১৮৮৫ সালে টেলিগ্রাফ অফিস গড়ে ওঠে। প্রাতিষ্ঠানিক মাইলফলকগুলো: পৌরসভা ১৬ জুন ১৮৬৯ (জেলা বিচার বিভাগের ইতিহাস-পাতা), মহকুমা ৮ জানুয়ারি ১৯৭৯, আর জেলা ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪ (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ময়মনসিংহের সঙ্গে এই জেলার প্রশাসনিক বন্ধনও তখনকার — ১৭৮৭ সালে ময়মনসিংহ জেলা গঠনের সময় থেকেই শেরপুর তার অংশ ছিল।

শের আলী গাজী: জমিদার যিনি সাধকও

জেলার নাম যাঁর নামে, সেই শের আলী গাজী ছিলেন গাজী বংশের শেষ জায়গীরদার-জমিদার। অষ্টাদশ শতকের শুরুতে তিনি বর্তমান গাজীর খামার (গরজরিপা) থেকে ২১ বছর স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন (জেলা জজ আদালতের ইতিহাস-পাতা)। ইতিহাস-গ্রন্থগুলোতে তিনি একই সঙ্গে শাসক ও সংসারত্যাগী সিদ্ধপুরুষ সাধক — এই দ্বৈত পরিচয়ই তাঁকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে (সাহিত্য-বিষয়ক গ্রন্থ)। তাঁর মাজার শেরপুর সদর উপজেলার গাজীর খামার এলাকার গিদ্দাপাড়ায় — জেলার প্রত্ননিদর্শনের তালিকায় 'শের আলী গাজীর মাজার' নামটি স্পষ্টভাবেই আছে। মাজারে গেলে ভদ্রতা ও স্থানীয় রীতি মেনে চলুন। এই ভূমির সংগ্রামী ইতিহাসও গভীর: ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের যুগে পাগলপন্থী নেতা টিপু শাহ এই এলাকায় সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে রাজধানী করেছিলেন গজরিপায় (জেলা বিবরণ)।

শহরের ঐতিহ্য: চারু ভবন, মাইসাহেবা আর হারানো নয়আনী

শহরে ঢুকতেই চোখে পড়ে প্রায় আড়াইশো বছরের পুরোনো মাইসাহেবা জামে মসজিদ (ভ্রমণ-বিবরণ)। গোপালবাড়ী বটতলার কাছে দাঁড়িয়ে লাল রঙের কারুকার্যময় চারু ভবন — প্রায় দেড় শতাব্দী প্রাচীন পৌরসভার এই ভবনটির মূল অংশ নির্মিত হয় ১৯৩০ সালে মাত্র ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে; তৎকালীন চেয়ারম্যান হেমন্ত চন্দ্র চৌধুরী বাকি ৫ হাজার টাকা দান করেন বাবা রায় বাহাদুর চারু চন্দ্র চৌধুরীর নামে ভবনটির নামকরণের শর্তে (প্রথম আলো, ২০১৭)। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর গল্প নয়আনী জমিদার বাড়ির: ঊনবিংশ শতকের গোড়ার এই প্রাসাদ-কমপ্লেক্স (রঙমহল, মন্দিরসমেত) ১৯৬৪-এর পর শেরপুর কলেজের ছাত্রাবাস, ১৯৭৮–৮৪-এ মহকুমা ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়; তারপর নব্বইয়ের দশকের শুরুতে পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয় — আজ সেখানে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও জজ আদালতের ভবন। অথচ ২০১৪ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর স্থাপনাবিহীন এই স্থানটিকেই পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে (উইকিপিডিয়া)! শহরে টিকে থাকা আরেক নিদর্শন জমিদার সত্যেন্দ্র মোহন ও জ্ঞানেন্দ্র মোহন চৌধুরীর বাসভবন — পৌনে তিন আনী জমিদার বাড়ি (ভ্রমণ-বিবরণ)। জেলার প্রাচীন নিদর্শনের তালিকায় আরও আছে গড়জরিপার দুর্গ (১৪৮৬–৯১), হযরত শাহ কামালের মাজার (১৬৪৪) ও কসবার মুঘল মসজিদ।

ভ্রমণ তথ্য

যাওয়া: ঢাকা (মহাখালী) থেকে সরাসরি বাসে শেরপুর (প্রায় ১৮৩ কিমি); জামালপুর-ময়মনসিংহ থেকেও বাস-সিএনজি চলে। দেখা: মাইসাহেবা মসজিদ ও চারু ভবন শহরেই; শের আলী গাজীর মাজার সদর উপজেলার গাজীর খামারে (শহর থেকে স্থানীয় যানে)। সমন্বয়: শেরপুরকে ঘাঁটি করে গজনী, মধুটিলা ও রাজার পাহাড় ঘোরা যায় — সেগুলোর আলাদা গাইড এই ব্যাচেই আসছে। কখন: শীতকাল আরামদায়ক; মাজারের ওরসের সময় ভিড় বেশি থাকে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

শেরপুর নাম এলো কীভাবে?

গাজী বংশের শেষ জমিদার শের আলী গাজীর নামে (জেলা বিচার বিভাগ)।

'দশকাহনিয়া' মানে কী?

খেয়া পারাপারের বার্ষিক ভাড়া দশ কাহন কড়ি থেকে নামটি এসেছে বলে প্রচলিত ব্যাখ্যা (উইকিপিডিয়া)।

শের আলী গাজীর মাজার কোথায়?

শেরপুর সদরের গাজীর খামার এলাকার গিদ্দাপাড়ায়।

শেরপুর কবে জেলা হয়?

২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪; মহকুমা হয়েছিল ১৯৭৯ সালে (উইকিপিডিয়া)।

নয়আনী জমিদার বাড়ি কি এখনো আছে?

না — নব্বইয়ের দশকে ভেঙে ফেলা হয়েছে; তবু স্থানটি ২০১৪ সালে প্রত্নতালিকাভুক্ত (উইকিপিডিয়া)।

চারু ভবন কী?

শেরপুর পৌরসভার ঐতিহ্যবাহী ভবন (মূল অংশ ১৯৩০), রায় বাহাদুর চারু চন্দ্র চৌধুরীর নামে নামকরণ (প্রথম আলো)।

শেষকথা

শেরপুর শহর ছোট, কিন্তু এর প্রতিটি নামের পেছনে স্তরে স্তরে ইতিহাস — কড়ির ভাড়া, গাজীর শাসন, সাধকের মাজার আর ভেঙে ফেলা প্রাসাদের স্মৃতি। গারো পাহাড়ে ওঠার আগে এই শহরটাকে একটা দিন দিলে পুরো জেলার গল্পটা অনেক পরিষ্কার হয়ে যায়।