• 29 Oct, 2026

টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপ ভ্রমণ গাইড: মেরিন ড্রাইভের শেষ প্রান্তে নাফ নদীর মোহনা

টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপ ভ্রমণ গাইড: মেরিন ড্রাইভের শেষ প্রান্তে নাফ নদীর মোহনা

দেশের দক্ষিণতম মূল ভূখণ্ড টেকনাফ — মেরিন ড্রাইভের শেষ প্রান্ত, সাবরাং জিরো পয়েন্ট, মাথিনের কূপ আর সড়কে যুক্ত শাহপরীর দ্বীপের তিন সৈকত; নাফের ওপারে মিয়ানমারের পাহাড় দেখার সম্পূর্ণ ভ্রমণ গাইড, জেটির নিরাপত্তা সতর্কতাসহ।

মেরিন ড্রাইভ ধরে কক্সবাজার থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে গেলেই দেশের মানচিত্রের শেষ সীমান্ত-শহর টেকনাফ — একদিকে বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে নাফ নদী, ওপারে মিয়ানমারের আরাকান পাহাড়শ্রেণি। কক্সবাজারের চিরচেনা ভিড় এখানে এসে থেমে যায়; বদলে মেলে নির্জন সৈকত, জেলেজীবন আর সীমান্ত-প্রকৃতির অন্যরকম আবহ। উপকূল নিয়ে আমাদের সিরিজের আগের পর্ব সীতাকুণ্ড: একেক মৌসুমে একেক সাজ — এবার সেই উপকূলের একদম শেষ প্রান্তের গাইড।

টেকনাফে যা দেখবেন

মেরিন ড্রাইভের শেষ অংশ ও সাবরাং জিরো পয়েন্ট: কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভের শেষ মাথা সাবরাং — এই অংশে একপাশে পাহাড়, অন্যপাশে খোলা সাগর। সাবরাংয়ে সরকারি ‘সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক’ প্রকল্প (৯৬৭ একর, বেজা) এক দশকেও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি — তাই এটিকে তৈরি পর্যটন কেন্দ্র ভেবে যাবেন না; তবে সাবরাং পয়েন্টের প্রাকৃতিক দৃশ্য, ঘড়ি-ভাস্কর্য ও নির্জন সৈকত এমনিতেই দর্শনীয়।

টেকনাফ সৈকত ও নাফ নদীর তীর: শহরের কাছের সৈকতগুলো কোলাহলমুক্ত; জালিয়াপাড়া এলাকার নাফ-জেটিগুলো থেকে নদীর মাঝামাঝি গিয়ে ওপারের মিয়ানমারের পাহাড় দেখা এখন পর্যটকদের প্রিয় অভিজ্ঞতা। সূর্যাস্তে নাফের জল আর পাহাড়ের রঙ বদল অসাধারণ।

মাথিনের কূপ: টেকনাফ শহরের থানা চত্বরে এই কূপ ঘিরে প্রচলিত আছে রাখাইন তরুণী মাথিনের করুণ প্রেমের লোকগাথা — টেকনাফ বেড়াতে গেলে স্থানীয়দের মুখে গল্পটা শোনা প্রায় অবধারিত আচার।

শাহপরীর দ্বীপ

টেকনাফ শহর থেকে মাত্র ১৩–১৪ কিলোমিটার দক্ষিণে সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ — নামে দ্বীপ হলেও এখন সংযোগ সড়কে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত, আলাদা নৌকা লাগে না (বর্ষায় কোনো কোনো অংশে ট্রলার লাগতে পারে)।

  • তিনটি সৈকত: দ্বীপে ছোট-বড় তিনটি বিচ — ঝাউবাগান, নারিকেল সারি আর খোলা বালিয়াড়ি; আকাশ পরিষ্কার থাকলে দূরে সেন্টমার্টিনের আভাসও মেলে।
  • ভূগোলের পাঠ: একই জায়গা থেকে নাফের মোহনা, বঙ্গোপসাগর আর মিয়ানমারের মংডু অঞ্চলের পাহাড় — দেশের মানচিত্রের একদম কিনারায় দাঁড়ানোর অনুভূতি।
  • জেলেজীবন ও লবণের মাঠ: সংযোগ সড়কের দুই ধারে বিস্তীর্ণ লবণ চাষ, দ্বীপের বাজার আর জেলেদের দৈনন্দিন জীবন — ছবি তোলার জন্য চমৎকার, তবে মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।

জেটি নিয়ে জরুরি সতর্কতা: শাহপরীর দ্বীপের ৫৫০ মিটার দীর্ঘ পর্যটক জেটিটি (২০০৪ সালে নির্মিত) দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বর্তমানে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ — রেলিং ভেঙে পড়েছে, বড় যান ওঠা নিষেধ আছে (সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সংবাদ অনুযায়ী)। জেটিতে ভিড় করে ওঠা বা প্রান্তে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন, দায়িত্বরত বিজিবি/কোস্টগার্ডের নির্দেশ মানুন। আরও মনে রাখুন — বর্তমান নিয়মে সেন্টমার্টিনগামী পর্যটক জাহাজ ছাড়ে শুধু কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে; এই জেটি থেকে সেন্টমার্টিনের টিকিটের প্রস্তাব গ্রহণ করবেন না।

যাতায়াত ও পরিকল্পনা

ঢাকা থেকে সরাসরি টেকনাফগামী বাস আছে; কক্সবাজার থেকে মেরিন ড্রাইভে বাস/রিজার্ভ গাড়িতে প্রায় ২–২.৫ ঘণ্টা (রিজার্ভ নিলে পথে হিমছড়ি-ইনানি-পাতুয়ারটেক থামার সুযোগ থাকে)। টেকনাফ থেকে শাহপরীর দ্বীপে সিএনজিতে ৪০–৪৫ মিনিট। টেকনাফে সাধারণ মানের হোটেল আছে; অনেকে কক্সবাজারে থেকে দিনে গিয়ে ফিরলেও, সূর্যাস্ত ধরতে চাইলে টেকনাফে এক রাত থাকা সুবিধাজনক।

সীমান্ত এলাকার শিষ্টাচার

  • জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন; চেকপোস্টে সহযোগিতা করুন।
  • সীমান্ত চৌকি, বিজিবি স্থাপনা ও নৌযানের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন; নির্দেশিত এলাকার বাইরে নদীতে নামা বা সীমানা অতিক্রমের চেষ্টা একদমই নয়।
  • সৈকতে লাইফগার্ড নেই — স্রোত ও জোয়ার-ভাটা না বুঝে পানিতে নামবেন না।
  • স্থানীয় (রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরসহ) সংবেদনশীল এলাকায় অনুমতি ছাড়া প্রবেশ বা ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

শাহপরীর দ্বীপে কি নৌকা করে যেতে হয়?
সাধারণত না — সংযোগ সড়ক হয়ে সিএনজি/গাড়িতেই যাওয়া যায়; বর্ষায় কিছু অংশে ট্রলার প্রয়োজন হতে পারে।

টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়া যায়?
পর্যটক জাহাজের ক্ষেত্রে না — বর্তমান নিয়মে জাহাজ শুধু কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে ছাড়ে।

সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক কি চালু হয়েছে?
না — প্রকল্পটি এখনো অসম্পূর্ণ; সাবরাং পয়েন্টের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা গেলেও পার্কের প্রতিশ্রুত সুবিধাগুলো এখনো তৈরি হয়নি।

শেষকথা

মানচিত্রের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নাফ আর সাগরের মিলন দেখার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশে একটাই — টেকনাফ। নিয়ম মেনে, নিরাপত্তা মাথায় রেখে ঘুরে আসুন; আর পাহাড়ের গভীরে হারাতে চাইলে সঙ্গী হোক বান্দরবান - মেঘ পাহাড়ের দেশ। আপনার যাত্রা শুভ হোক!