• 01 Nov, 2026

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ভ্রমণ গাইড — ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ১২০০ একর ক্যাম্পাসের দর্শনীয় স্থান, বিজিসিআই-স্বীকৃত বোটানিক্যাল গার্ডেনের ঔষধি সংগ্রহ এবং ভ্রমণ তথ্য।

ময়মনসিংহ শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে, পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম তীরে ১,২০০ একর সবুজের এক রাজ্য — বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়; মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ, দুটি জাদুঘর, আন্তর্জাতিক খ্যাতির জার্মপ্লাজম সেন্টার আর দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক-স্বীকৃত বোটানিক্যাল গার্ডেন মিলিয়ে ময়মনসিংহ ভ্রমণের অন্যতম সেরা গন্তব্য।

১৯৬১: দেশের প্রথম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট "পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়" নামে যাত্রা শুরু — এটি বাংলাদেশের প্রথম বিশেষায়িত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আয়তনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস (বাংলা উইকিপিডিয়া; বাংলাপিডিয়া)। শুরুতে ছিল মাত্র দুটি অনুষদ — ভেটেরিনারি ও কৃষি (২৩টি বিভাগ, ৩০ জন শিক্ষক, ৪৪৪ জন শিক্ষার্থী); কয়েক মাসের মধ্যে পশুপালন, পরে কৃষি অর্থনীতি (১৯৬৩–৬৪), কৃষি প্রকৌশল (১৯৬৪–৬৫) ও মৎস্যবিজ্ঞান (১৯৬৭–৬৮) অনুষদ যোগ হয় (বাংলাপিডিয়া)। স্বাধীনতার পর নাম হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; আজ ছয়টি অনুষদে চল্লিশের বেশি বিভাগ। ক্যাম্পাসের ভেতরেই আছে দুটি জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান — বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) (বাংলাপিডিয়া)। বাউ-ধানসহ নানা ফসলের জাত উদ্ভাবন আর ইলিশের জিনরহস্য উন্মোচনের মতো গবেষণায় এখানকার গবেষকদের ভূমিকা দেশের কৃষিবিজ্ঞানে এই ক্যাম্পাসের জায়গা পাকাপোক্ত করেছে।

ক্যাম্পাসে যা যা দেখবেন

"প্রকৃতিকন্যা" নামে পরিচিত ক্যাম্পাসে ঢুকলেই বোঝা যায় কেন এটি দর্শনার্থীদেরও টানে। ক্যাম্পাসের মাঝ দিয়ে চলে গেছে রেললাইন — সবুজের বুক চিরে ট্রেন যাওয়ার দৃশ্য ক্যাম্পাসের স্বাক্ষর। দর্শনীয় তালিকায় আছে: কৃষি জাদুঘর (দেশের একমাত্র কৃষি জাদুঘর হিসেবে পরিচিত) ও ফিস মিউজিয়াম; মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে বিজয় '৭১ ও বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার; ফলদ বৃক্ষের জার্মপ্লাজম সেন্টার, যার সংগ্রহ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত; আম-লিচুর বাগান, লেক আর মৎস্য খামারের পুকুর; দুই হাজার আসনের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তন, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, স্টেডিয়াম ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। শীতে (নভেম্বর–মার্চ) ক্যাম্পাসজুড়ে ফোটে গাঁদা, ডালিয়া, জিনিয়া, সূর্যমুখী আর গোলাপের বাহার। জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা দেখে এখানে এলে ময়মনসিংহের শিল্প-প্রকৃতি-গবেষণার ত্রিভুজ পূর্ণ হয়।

বোটানিক্যাল গার্ডেন: জীবন্ত ঔষধি বিশ্বকোষ

ক্যাম্পাসের পূর্ব প্রান্তে, নদের ধারে প্রায় ২৪–২৫ একর জুড়ে বোটানিক্যাল গার্ডেন — প্রতিষ্ঠা ১৯৬৩ সালে, পরিচালনায় ফসল উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ (বাংলা উইকিপিডিয়া)। এটি বাংলাদেশের প্রথম বোটানিক্যাল গার্ডেন, যা আন্তর্জাতিক সংস্থা বোটানিক গার্ডেনস কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালের (বিজিসিআই) স্বীকৃতি পেয়েছে। সংগ্রহে প্রায় ৬০০ প্রজাতির উদ্ভিদ — গাছের হিসাবে হাজারের বেশি বড়, প্রায় ১,৩০০ মাঝারি ও সাড়ে চার হাজারের বেশি ছোট বৃক্ষ। সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ঔষধি অঞ্চল: অশ্বগন্ধা, সর্পগন্ধা, গন্ধভাদুলি, পুনর্নবা, কুর্চি, শতমূলীসহ প্রায় ৫০ প্রজাতির ভেষজ; আছে ননি ফল, চা ও কফি গাছের মতো বিরল সংগ্রহও (সমকাল; বাসস)। প্রতিটি গাছের পরিচিতি-ফলক থাকায় হাঁটতে হাঁটতেই পড়া হয়ে যায় এক জীবন্ত বিশ্বকোষ। প্রবেশ ফি নামমাত্র (ভ্রমণ-সূত্রে ১০ টাকা; বদলাতে পারে)।

ভ্রমণ তথ্য

যাওয়া: ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ৩–৪ কিলোমিটার দক্ষিণে; রিকশা/অটোতে সহজে পৌঁছানো যায়। গুরুত্বপূর্ণ: এটি সক্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান — দর্শনার্থী হিসেবে শিষ্টাচার মেনে চলুন, শিক্ষা ভবন ও হলে অকারণে ঢুকবেন না; পরীক্ষা বা বিশেষ সময়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ সীমিত থাকতে পারে। সময়: শীতের সকাল সেরা — ফুলের মৌসুম ও হালকা রোদ মিলে পুরো ক্যাম্পাস হেঁটে দেখার উপযুক্ত সময়; পুরো ক্যাম্পাসের জন্য অন্তত অর্ধেক দিন রাখুন। টিপস: বোটানিক্যাল গার্ডেন দিয়ে শুরু করে জাদুঘর দুটি দেখে নদীপাড়ে শেষ করুন; ক্যাম্পাসের ভেতরের ক্যান্টিনে স্থানীয় খাবার মেলে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বাকৃবি কবে প্রতিষ্ঠিত?

১৮ আগস্ট ১৯৬১, "পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়" নামে (বাংলাপিডিয়া)।

ক্যাম্পাসের আয়তন কত?

প্রায় ১,২০০ একর — আয়তনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।

বোটানিক্যাল গার্ডেন কেন বিশেষ?

এটি বাংলাদেশের প্রথম বিজিসিআই-স্বীকৃত বোটানিক্যাল গার্ডেন; প্রায় ৬০০ প্রজাতির উদ্ভিদ, সমৃদ্ধ ঔষধি সংগ্রহ (বাংলা উইকিপিডিয়া; সমকাল)।

সাধারণ দর্শনার্থী কি ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারে?

সাধারণত পারে, তবে এটি সক্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় — নিয়ম ও শিষ্টাচার মেনে ঘুরতে হয়, বিশেষ সময়ে প্রবেশ সীমিত থাকতে পারে।

ক্যাম্পাসে জাদুঘর কয়টি?

দুটি — কৃষি জাদুঘর ও ফিস মিউজিয়াম।

যেতে শহর থেকে কতদূর?

প্রায় ৩–৪ কিলোমিটার দক্ষিণে, পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের পশ্চিম তীরে।

শেষকথা

যে ক্যাম্পাসে গবেষণা হয় ধানক্ষেতে আর জিনের গভীরে, সেখানে একটি দিন কাটানো মানে বাংলাদেশের কৃষির ভবিষ্যৎ কাছ থেকে দেখা। আর বোটানিক্যাল গার্ডেনের ছায়ায় দাঁড়ালে বোঝা যায় — "প্রকৃতিকন্যা" উপাধিটা এই ক্যাম্পাস এমনি এমনি পায়নি।