জামালপুর শহরে বেড়াতে গেলে জেলার আসল সম্পদটা চোখে পড়বে দোকানের তাকে আর গ্রামের আঙিনায় — রঙিন সুতোয় ফোঁড় তোলা নকশিকাঁথা। পুরোনো শাড়ি-ধুতির স্তরে স্তরে সাধারণ ফোঁড়ে (রানিং স্টিচ) জীবনের গল্প বুনে তোলার এই শিল্প বাংলার ঘরে ঘরে শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে আছে; আর তার সবচেয়ে জীবন্ত কেন্দ্রগুলোর একটি জামালপুর — এতটাই যে জেলা প্রশাসন পুরো জেলাকেই ব্র্যান্ডিং করেছে এই কাঁথার নামে (প্রথম আলো)।
সুতোয় বোনা জীবন: নকশিকাঁথার ইতিহাস
'নকশি' এসেছে 'নকশা' থেকে, 'কাঁথা' সংস্কৃত 'কোন্থা' (ছেঁড়া কাপড়) থেকে — এমনটাই ভাষ্যগুলো বলে। শিল্পটির প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে কৃষ্ণদাস কবিরাজের 'চৈতন্য চরিতামৃতে' (গবেষণা-প্রবন্ধ)। অভাবের সংসারে পুরোনো কাপড় ফেলে না দিয়ে স্তরে স্তরে সেলাই করে গরমের আচ্ছাদন বানানো থেকেই এর জন্ম; তারপর সেই ক্যানভাসে ফুটে উঠতে থাকে পদ্ম, ময়ূর, মাছ, নৌকা, কৃষকের খেত, বিয়ে-উৎসবের দৃশ্য — অর্থাৎ সেলাইকারীর নিজের জীবনই। এই শিল্পকে বিশ্বের পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয় পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের 'নকশী কাঁথার মাঠ' (১৯২৯) — সাজুর সেলাই করা কাঁথায় প্রেম ও বেদনার সেই আখ্যান আজও কাঁথার সবচেয়ে পরিচিত পরিচয় (পাঠ্যবই/ডেইলি সান)।
জামালপুর কেন আলাদা: ঘন সেলাই আর জিআই স্বীকৃতি
জামালপুরের কাঁথার স্বাতন্ত্র্য এক কথায় — ঘন সেলাই। জেলার নারীদের সূচিকর্মের দক্ষতা তুলনাহীন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা; এখানকার কাঁথায় সেলাইয়ের ঘনত্বই এর সই (প্রথম আলো, জানুয়ারি ২০২৬)। জেলার সবকটি উপজেলাতেই কাঁথা তৈরি হয় — সদর, সরিষাবাড়ী, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জের টিম লিডারদের মাধ্যমে ঘরে বসেই কাজ করেন গ্রামের নারীরা। ঐতিহ্যের বয়স এখানে ১০০–১৫০ বছর, বাণিজ্যিক রূপ পেয়েছে প্রায় ৫০ বছর ধরে (শিল্প-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য)। বড় মাইলফলক আসে ২০২৪ সালে: জামালপুরের নকশিকাঁথা পায় ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি — ওই বছরের এপ্রিলে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) আয়োজনে আনুষ্ঠানিকভাবে জিআই সনদ হস্তান্তরিত হয় (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস; ঢাকা ট্রিবিউন)। বাণিজ্যিক বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে ব্র্যাকের আয়েশা আবেদ ফাউন্ডেশন (আড়ংয়ের জন্য প্রথমদিকে এখানকার কাঁথা উৎপাদন) আর এসএমই ফাউন্ডেশনের ক্লাস্টার উদ্যোগ (প্রথম আলো)।
ঘরের আঙিনা থেকে বিশ্ববাজার
আজ জামালপুরের সূচিকাজ শুধু কাঁথায় সীমাবদ্ধ নয় — তৈরি হচ্ছে বিছানার চাদর, কুশন কভার, পাঞ্জাবি, ওয়াল হ্যাংগিং, শাল, থ্রি-পিস, বালিশের কভার; নকশায় এখন মানুষ-প্রাণীর মোটিফ কমে জায়গা নিয়েছে ফুল, লতা আর আলপনা (প্রথম আলো)। নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা পাঁচ শতাধিক (ঢাকা ট্রিবিউন); জেলাজুড়ে উদ্যোক্তা দুই হাজারের বেশি ও দোকান প্রায় দুই শতাধিক বলে জানান শিল্প-সংশ্লিষ্টরা (প্রথম আলো)। জাতীয় পর্যায়ে এই শিল্পে জড়িত প্রায় তিন লাখ মানুষ, যাঁদের ৯৯ শতাংশই নারী (বাংলাদেশ পোস্ট — লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা)। চরের নারীদের কাছে এই সেলাই শুধু শিল্প নয়, ভাঙনে সব হারিয়েও টিকে থাকার অর্থনীতি (বাংলাদেশ পোস্টের প্রতিবেদন)।
সংকটের সৎ ছবি
সাফল্যের পাশাপাশি ঘাটতিটাও বলা দরকার: কারিগরদের হাতের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি — প্রশিক্ষণ ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের অভাবে অনেক শিল্পী কাঁথা ছেড়ে বিকল্প কাজে ঝুঁকছেন বলে মতপ্রবন্ধে সতর্ক করা হয়েছে (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর)। জিআই স্বীকৃতির পরের কাজ — ব্র্যান্ডিং, বাজারে প্রবেশাধিকার আর নকল ঠেকানো — এখনো অসম্পূর্ণ (ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদকীয়)। অর্থাৎ আসল জামালপুরের কাঁথা কিনলে শুধু একটি পণ্য নয়, একটি টিকে-থাকার লড়াইকেও সমর্থন করা হয়।
কেনাকাটা ও ভ্রমণ তথ্য
কোথায় কিনবেন: জামালপুর শহরের হস্তশিল্পের দোকানগুলোতে (জেলায় প্রায় ২০০ দোকান — প্রথম আলো) এবং ঢাকার মেলা-হস্তশিল্প বিপণিতে; বিসিকের মেলাগুলোতেও জামালপুরের স্টল থাকে। আসল চেনা: ঘন, সমান ফোঁড় আর হাতে-টানা নকশার অসম্পূর্ণতাই হাতের কাজের প্রমাণ; জিআই-স্বীকৃত পণ্য কিনছেন কিনা বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করুন। দাম: আকার, কাপড় ও সেলাইয়ের ঘনত্বভেদে ব্যাপক তারতম্য — দরদাম করে কিনুন, তবে কারিগরের শ্রমের মূল্য মনে রাখুন। একই বিভাগের আরেক জিআই-তারকা মুক্তাগাছার মণ্ডা — জামালপুর সফরে ময়মনসিংহ হয়ে গেলে দুটোই এক সফরে মিলবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
জামালপুরের নকশিকাঁথা কবে জিআই স্বীকৃতি পায়?
২০২৪ সালে; এপ্রিল ২০২৪-এ ডিপিডিটির আয়োজনে আনুষ্ঠানিক জিআই সনদ হস্তান্তরিত হয় (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)।
জামালপুরের কাঁথার বিশেষত্ব কী?
অসাধারণ ঘন সেলাই — এটাই জেলার কাঁথার স্বাক্ষর (প্রথম আলো)।
শুধু কাঁথাই কি তৈরি হয়?
না — চাদর, কুশন, পাঞ্জাবি, ওয়াল হ্যাংগিং, শালসহ বহু পণ্যে এখন এই সূচিকাজ ব্যবহৃত হয়।
কাঁথা সেলাই করেন মূলত কারা?
গ্রামের নারীরা — জাতীয়ভাবে শিল্পীদের ৯৯ শতাংশই নারী (বাংলাদেশ পোস্ট)।
'নকশী কাঁথার মাঠ' কার লেখা?
পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের আখ্যানকাব্য, প্রকাশিত ১৯২৯ সালে।
জেলার কয়টি উপজেলায় কাঁথা তৈরি হয়?
জেলার সবকটি উপজেলাতেই (প্রথম আলো)।
শেষকথা
একটি নকশিকাঁথা মানে মাসের পর মাস ধরে তোলা হাজার হাজার ফোঁড় — তার প্রতিটিতে একজন নারীর ধৈর্য, চোখের জল আর স্বপ্ন। জামালপুরের ঘন সেলাই সেই ধৈর্যেরই সবচেয়ে নিখুঁত রূপ; জিআই সিল সেই রূপের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। সফরে একটা কাঁথা কিনে আনুন — সেটা হবে এই জেলার সেরা স্মৃতিচিহ্ন।